নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসনকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড থেকে চলে যেতে হয়েছিল।
সেপ ব্লাটারকেও চলে যেতে হলো বিশ্ব ফুটবল পরিচালনা সংস্থা ফিফা থেকে।
ঠিক এক সপ্তাহ আগে সযত্নে ঠাসা হয়েছিল যে বিস্ফোরণের বারুদ, তার রিমোটে চাপ পড়ল মঙ্গলবার রাতে। দুর্নীতির যে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল জুরিখ থেকে লন্ডন। মস্কো থেকে বার্লিন। প্যারিস থেকে রিও ডি জেনেইরো।
সেপ ব্লাটার বাধ্য হলেন ফিফা থেকে সরে যেতে। সেপ ব্লাটার বাধ্য হলেন দুর্নীতির ফাঁসে দমবন্ধ হয়ে ইস্তফা দিয়ে বিদায় নিতে।
ফিফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মিশেল প্লাতিনি বলেছিলেন, সরে যাও। ব্লাটার শোনেননি। ফুটবল-পৃথিবীর অমিত শক্তিধর দেশগুলো বলেছে, আপনি নির্বাচন লড়বেন না। এটা সঙ্কটের সময়, নির্বাচনী ঢক্কানিনাদের নয়। ফিফা থেকে সরে যান। ব্লাটার পাত্তাই দেননি। সুইস টিভির এক সাংবাদিক ফিফা প্রেসিডেন্টকে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি সরছেন না কেন? ব্লাটারও সোজাসুজি বলে দিয়েছিলেন যে, সরে গেলেই তো অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া হবে।
ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বাহাত্তর ঘণ্টা কাটল মাত্র। ভোটব্যাঙ্কে চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়েও সেপ ব্লাটারের সিংহাসনে থাকা হল না। ফুটবল প্রশাসনে সম্রাটের তাজ খুলে তাঁকে আবার ফিরতে হচ্ছে কলঙ্কের পৃথিবীতে। অপমানের দুনিয়ায়।

রাতের দিকে ফুটবল মহলের কারও কারো মনে হচ্ছে, নির্বাচনটা জিতে নিজেকে আরো অতলস্পর্শী খাদের দিকে ঠেলে নিয়ে গেলেন সেপ ব্ল্যাটার নিজেই। পঞ্চম বার ফিফা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার একগুঁয়ে প্রত্যাবর্তনের পর নতুন একটা যুদ্ধের জন্ম হয়েছিল— আমেরিকা+ব্রিটেন বনাম ব্ল্যাটার। যে যুদ্ধের পরিণতি— মঙ্গলবার সকালে মার্কিন ও ব্রিটিশ দৈনিকের একটা খবর। যৌথ প্রচেষ্টা যাকে বললে খুব ভুল হবে না।
মার্কিন সংবাদপত্রে এ দিন প্রথম বেরোয়, ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগে নাকি সে দেশের ফুটবল সংস্থার তরফে এক কোটি ডলার ফিফার অ্যাকাউন্টে দেয়া হয়েছিল! যে লেনদেনে জড়িত ছিলেন ফিফার বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল জেরোম ভালকে! পরের দিকে ব্রিটিশ দৈনিক সোজা চিঠিটাই তুলে ছাপিয়ে দেয়। যেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, চিঠির প্রেরক দক্ষিণ আফ্রিকান ফুটবল সংস্থা। প্রাপক জেরোম ভালকে! ‘ব্লাটারের ডান হাত’ এই ভালকে-কে উদ্দেশ করেই চিঠিতে লেখা হচ্ছে, ‘ফিফাকে ১ কোটি ডলার দিচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার।’
কেন? ফুটবলের উন্নতির লক্ষ্যে।
এই চিঠি ও খবর প্রকাশের পরেই প্রবল চাপে পড়ে যায় ফিফা। কারণ, ততক্ষণে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, টাকাটা আসলে নিয়েছিলেন ইতিমধ্যেই ফিফা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত জ্যাক ওয়ার্নার ও চাক ব্লেজার। বিনিময়ে তাদের কাজটা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভোটটা দেয়া, তাদের ২০১০ বিশ্বকাপ আয়োজকের সম্মান পাইয়ে দেয়া! ভালকে নাকি ওই এক কোটি ডলার চালান করে দিয়েছিলেন ফিফার প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়ার্নারের কোনো অ্যাকাউন্টে।
মার্কিন দৈনিক সটান বলে দেয়, ব্ল্যাটারও গাড্ডার দিকে এগোচ্ছেন। কারণ, তার বিশ্বস্ত অনুগামী ভালকে পর্যন্ত যখন তদন্ত পৌঁছেছে, ধরে নেওয়া যায়, ব্লাটারের নামও এ বার তদন্তে উঠতে শুরু করবে। দুর্নীতির নাগপাশে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়া ফিফা এর পর নিরুপায় হয়ে দাবি করতে শুরু করে, গোটা ব্যাপারটায় ভালকের কোনো ভূমিকাই ছিল না। কারণ, প্রয়াত প্রাক্তন ফিফা কর্তা জুলিও গ্রোন্দোনা নাকি ওই সময়ে ফিফা ফিনান্স কমিটি দেখতেন। ফিফা-র দাবি, টাকা গিয়েছিল তারই হাত ঘুরে। এবং এই টাকাটাও দেয়া হয়েছিল জ্যাক ওয়ার্নারের একটা ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্পে। তিনিই নাকি ছিলেন ওই প্রকল্পের সর্বেসর্বা। অন্তত চিঠিতে তেমনই বলা ছিল।
শোনা মাত্র যে বক্তব্যকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দেয় ফুটবল মহল। কারণ প্রথমত, যার নামে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তার হাত দিয়ে টাকা যায়নি— এটাই অবিশ্বাস্য। দ্বিতীয়ত, এফবিআই ও আইআরএসের (ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস)-এর কথা ধরলে, এই এক কোটি ডলার থেকে সাড়ে সাত লক্ষ নাকি চলে গিয়েছিল চাক ব্লেজারের কাছে! সেখানেই প্রশ্ন, টাকাটা ফুটবল-উন্নয়নের জন্য শুধু ওয়ার্নারকে দেয়া হলে ব্লেজার তার বখরা পান কী করে? এ তো নির্বোধেও বুঝবে এটা ঘুষ! নির্লজ্জ উৎকোচ-গ্রহণ।
যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নাটক দ্রুতই মহানাটকে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ফিফা এত তড়িঘড়ি সংবাদ সম্মেলন ডাকে যে, এমন যুগান্তকারী সম্মেলনেও তেরো জনের বেশি সাংবাদিক আসতে পারেননি। যেখানে সর্বশেষ নাটকটা হয়।
ব্লাটার ইস্তফার কথা ঘোষণা করে দেন।
বলেন, ‘‘ফিফা আমার কাছে সব। ফিফার স্বার্থই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি সরে যাচ্ছি ফিফা থেকে। আমি চাই খুব দ্রুত আরো একটা নির্বাচন হোক। সেখানে আমি দাঁড়াচ্ছি না। আজ থেকে আমি মুক্ত। আগামী ১৩ মে ফিফার পরবর্তী কংগ্রেস। কিন্তু আমি চাই তার আগেই কোনো যোগ্য ব্যক্তি আমার জায়গায় আসুন। ফিফাকে পুরো ঢেলে সাজা দরকার। দরকার পড়লে এগ্‌জিকিউটিভ কমিটিও নতুন করে গড়া হোক।’’
শুনলে মনে হবে, পরিস্থিতির বিচারে এটাই হওয়া উচিত। কলঙ্কের দায়ে প্রশাসনের সর্বাধিনায়ক চেয়ারে থাকবেন কেন? কিন্তু চিঁড়ে তাতে ভিজছে না। প্রশ্ন উঠছেই, ব্লাটার এত দিন গেলেন না। বারবার উদ্ধত মেজাজে চেয়ার ধরে রাখার শাসানি দিলেন। তা হলে আচমকা মঙ্গলবার সরে গেলেন কেন? তিনি কি বুঝতে পারছেন যে, এই চিঠি শুধু ঝড়ের মুখবন্ধ মাত্র? সত্যিটা বেরোলে অসম্মান আরও বাড়বে?
এত দিন ব্ল্যাটারের ঘোষিত মহাশত্রু মিশেল প্লাতিনি এ দিন আর তুলকালামের রাস্তায় যাননি। বরং ‘বন্ধু’র প্রস্থানে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘‘সাহসী সিদ্ধান্ত। কঠিন সিদ্ধান্ত। তবে ঠিক সিদ্ধান্ত।’’ তবে গ্যারি লিনেকার চিমটি কেটেছেন। টুইটে লিখেছেন, ‘ব্ল্যাটারকে খুব মিস করছি।’ কিন্তু চিন্তা রয়েই যাচ্ছে। ব্ল্যাটার বলছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচন হোক। কিন্তু ফিফার আর এক মহাকর্তা ডমিনিকো স্কালা বলেছেন, ‘‘এগ্‌জিকিউটিভ কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ডিসেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে নির্বাচন হবে।’’ সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন, মাঝের সময়টায় ফিফার প্রশাসন সামলাবেন কে? ইংল্যান্ডের সঙ্গে বেশ কয়েকটা দেশ রাতারাতি গর্জন তুলতে শুরু করেছে, রাশিয়া আর কাতারকে হঠাও। রাশিয়াকে যদি ২০১৮ বিশ্বকাপে গিলতেও হয়, চার বছর পর কাতারকে কোনোভাবেই বিশ্বকাপ দেয়া যাবে না। নতুন করে ‘বিড’ হোক। স্বচ্ছ নির্বাচনে উঠে আসুক আয়োজক দেশ।
আসল কথা হলো, ফিফায় সতেরো বছরের ব্লাটার যুগ মঙ্গলবারের জুরিখে শেষ হল যেমন, ঠিক তেমনই অসম্মানের মহাসমুদ্রে ডুবে গেল ফুটবল। ফিফার বেশ কিছু কর্তা দুর্নীতির দায়ে ইতিমধ্যেই এফবিআইয়ের হেফাজতে। এখন শোনা যাচ্ছে, গোটা তদন্তটার কেন্দ্রে নাকি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টা। সেই তদন্ত যত এগিয়েছে, উঠে এসেছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য। এমনকী ব্রাজিল বিশ্বকাপও রেহাই পায়নি। ব্রাজিল ফুটবল সংস্থার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিকার্ডো টেক্সেইরার বিরুদ্ধে টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠছে। তার অ্যাকাউন্ট থেকে দশ কোটি পাউন্ড বেরিয়ে কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না।
ব্ল্যাটার একটা কথা বারবার বলতেন এত দিন। বলতেন, তার আমলের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ক্রিকেট-অধ্যুষিত দেশের মজ্জায় ফুটবলকে ঢুকিয়ে দেয়া। কে জানত, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের তিন দিন ঘুরতে না ঘুরতেই সেই দক্ষিণ আফ্রিকার একটা চিঠি-বোমা বেমক্কা বিস্ফোরণে তার গদি টলিয়ে দেবে!