বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এখন আমাদের জীবনযাপনকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। সব ধরনের ঘটনাতেই এখন ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমগুলোর প্রভাব অনস্বীকার্য। আসছে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের হাওয়াও তেমনি বেশ জোরেশোরেই লেগেছে অনলাইনে। প্রচলিত নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রার্থীরা এখন ফেসবুককে বেছে নিয়েছেন প্রচারমাধ্যম হিসেবে। কোনো কোনো প্রার্থী আবার নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও পৌঁছাতে চেষ্টা করছেন ভোটারদের কাছে।

 সময়ের সাথে সাথে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল দুনিয়া এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক এখন পরিণত হয়েছে বিকল্প গণমাধ্যমে এবং মত প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে। জনমত গঠন থেকে শুরু করে প্রচার-প্রচারণার কাজেও অনলাইনের এসব মাধ্যমে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সাথে সাথে ২০০২ সালের পর এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনও অনলাইনের প্রভাবমুক্ত নয়। বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে ফেসবুক, টুইটার মিলে প্রচলিত নির্বাচনী প্রচারের সাথে সাথে অনলাইনও প্রার্থীদের জন্য পরিণত হয়েছে ভোটযুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ারে। এর মধ্যে অবশ্য ঢাকার দুই অংশের নির্বাচনী প্রার্থীরাই এগিয়ে রয়েছেন অনলাইনে।
এবারের চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১২ জন। ঢাকা উত্তরে মেয়র পদের প্রার্থীর সংখ্যা ১৬ এবং ঢাকা দক্ষিণে এই সংখ্যা ২০ জন। তিনটি সিটি কর্পোরেশনের ৪৮ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে বিশেষ করে ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাত জন প্রার্থী অনলাইন প্রচারণায় অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন যোজন যোজন। তাদের কথা তুলে ধরা হলো এই লেখায়।
আনিসুল হক
এক সময়ের জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অন্যতম আনিসুল হক ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী হয়েছেন ‘আমরা ঢাকা’র ব্যানারে। দেশের ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তিনি সাবেক সভাপতি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে এরই মধ্যে ইন্টারনেটকে নিজের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছেন আনিসুল হক। এর জন্য তার নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি তিনি ব্যবহার করছেন আমরা ঢাকার নিজস্ব ওয়েবসাইট (http://amradhaka.com)। এই সাইটে রয়েছে আনিসুল হকের নির্বাচনী ইশতেহারসহ তার নির্বাচনী জনসংযোগের সব ধরনের খবরাখবর এবং ঢাকা নিয়ে তার চিন্তাভাবনার নান ধরনের বহিঃপ্রকাশ। এই সাইটের পাশাপাশি আমরা ঢাকার ফেসবুক পেজেও (www.facebook.com/AmraDhaka) চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। ১ লক্ষ ৮২ হাজার লাইক রয়েছে এই পেজটিতে যেখানে মিলছে আনিসুল হকের ব্যক্তিজীবনের পরিচিতি থেকে নির্বাচন নিয়ে তার সব ধরনের প্রচারণার খবর। আগ্রহী সকলের নানা ধরনের মন্তব্য ও জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার কাজটিও করা হচ্ছে এই পেজটি থেকে।
জোনায়েদ সাকি
‘আগামীর ঢাকা, সকলে মিলে’ প্ল্যাটফর্ম থেকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তরুণ রাজনীতিবিদ মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, সংক্ষেপে যিনি জোনায়েদ সাকি নামেই পরিচিত। ছাত্রজীবন থেকেই বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত জোনায়েদ সাকি গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদের তরুণ এই প্রার্থীর কাছেও নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগত। এক্ষেত্রে মূলত সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকের ওপরেই জোর দিয়েছেন তিনি। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের (www.facebook.com/zonayed.saki1) মাধ্যমে অনলাইনে ভোটারসহ অন্যদের কাছে নিজের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছেন তিনি। এক্ষেত্রে নিজের অ্যাকাউন্টের চেয়েও এগিয়ে রয়েছে আগামীর ঢাকা প্ল্যাটফর্মের ফেসবুক পেজটি (www.facebook.com/agamirdhakapage)। নির্বাচনী ইশতেহার থেকে শুরু করে জনসংযোগের খবর, বিভিন্ন ইস্যুতে জোনায়েদ সাকির বিভিন্ন বক্তব্য ও বক্তব্যের লিংক, জোনায়েদ সাকিকে নিয়ে অন্যদের বিভিন্ন মন্তব্য প্রভৃতি রয়েছে এই পেজে। ৪২ হাজারেরও বেশি লাইক থাকা এই পেজে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের নানা ধরনের প্রশ্ন, কৌতূহল আর জিজ্ঞাসারও জবাব দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। একটু দেরিতে হলেও আগামীর ঢাকা প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব ওয়েবসাইটও (http://agamirdhaka.com) চালু করা হয়েছে। জোনায়েদ সাকির পরিচিতি, নির্বাচন নিয়ে প্রতিশ্রুতি ছাড়াও এখানে ভিজিটরদের সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মাহি বি চৌধুরী
তরুণ প্রজন্মেরা রাজনীতিবিদ হিসেবে মাহি বি চৌধুরী দেশব্যাপী পরিচিত এক নাম। শুরু থেকেই তিনি ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতে অত্যন্ত সক্রিয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তিনি নিজের তার অনলাইন কার্যক্রম বজায় রেখেই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে মাহি বি চৌধুরীর নিজস্ব ওয়েবসাইট (http://mahibchoudhury.com) তো বটেই, তার ফেসবুক পেজও (http://goo.gl/JnI9Tq) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, মাহি বি চৌধুরীর ফেসবুক পেজটি ভেরিফায়েড একটি পেজ এবং এই পেজ পছন্দকারীর সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশি। তবে মাহি বি’র নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে চলেছে তাকে সমর্থনকারী নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘প্রজন্ম শহর’। এই প্রজন্ম শহরের নিজস্ব ওয়েবসাইট (http://projonmoshohor.com/) ছাড়াও রয়েছে ফেসবুক পেজ (www.facebook.com/projonmoshohor)। প্রজন্ম শহরের ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজ থেকেই মিলছে মাহি বি চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণার সব ধরনের তথ্য, খোঁজখবর, মাহি বি চৌধুরীর ব্যক্তিগত সব তথ্য, তার নির্বাচনী ইশতেহার প্রভৃতি। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সক্রিয়দের সাথে মিথস্ক্রিয়ার কাজগুলো মূলত ফেসবুক পেজটিতেই হচ্ছে।
তাবিথ আউয়াল
বাবা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থীতা বাতিল হয়ে গেলে মূলত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নিজের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেন তাবিথ আউয়াল। বয়সে তরুণ তাবিথ মূলত ‘আদর্শ ঢাকা’ প্ল্যাটফর্মের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তার বাবার রাজনৈতিক পরিচয় সূত্রেই ভোটের রাজনীতিতে আর্বিভাব তাবিথ আউয়ালের। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মেয়র পদের প্রচারণায় তিনিও অন্যদের মতো অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে মূলত আদর্শ ঢাকা প্ল্যাটফর্মের ফেসবুক পেজটিই (www.facebook.com/adarshaDHAKA) মুখ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। নির্বাচনের সব ধরনের খবরাখবরই মিলছে এই ফেসবুক পেজে। ৪২ হাজারেরও বেশি অনুসরণকারী রয়েছে এই ফেসবুক পেজের। এর বাইরেও তাবিথ আউয়াল ফর মেয়র পেজটি (www.facebook.com/TabithAwal.ForMayor) অনলাইনে তাবিথ আউয়ালের নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ১ লক্ষ ১৮ হাজারেরও বেশি ব্যবহারকারী পছন্দ করে যুক্ত রয়েছেন এই পেজে। দুইটি ফেসবুক পেজই সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরেও অবশ্য তাবিথ আউয়ালের নামে বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভক্তরা নির্বাচনী প্রচারণা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে।
মির্জা আব্বাস
বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাস ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আইনি জটিলতার কারণে মাঠে তাকে দেখা যাচ্ছে না। অন্য নবীনদের মতো অবশ্য তার পক্ষের নির্বাচনী প্রচারণার কার্যক্রম অনলাইনে চলছে জোরেশোরেই। ঢাকা উত্তরের তাবিথ আউয়ালের মতো ঢাকা দক্ষিণে তিনি আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। সেক্ষেত্রে ৪২ হাজার লাইক পাওয়া আদর্শ ঢাকার ফেসবুক (www.facebook.com/adarshaDHAKA) পেজে চলছে তার নির্বাচনী প্রচারণা। এর বাইরে রাজনীতিবিদ ক্যাটাগরিতে মির্জা আব্বাসের নামে অফিশিয়াল একটি পৃথক ফেসবুক পেজও (www.facebook.com/MirzaAbbasOfficial) রয়েছে। মির্জা আব্বাসের নির্বাচনী ইশতেহারসহ নির্বাচন নিয়ে তার ও তার সমর্থকদের বক্তব্য, নির্বাচনী প্রচারণার খবরাখবর সবই মিলছে এই ফেসবুক পেজে। ৯১ হাজারেরও বেশি লাইক রয়েছে মির্জা আব্বাসের অফিশিয়াল এই ফেসবুক পেজে।
সাঈদ খোকন
বাবা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আওয়াজ ওঠার পর থেকেই বাবার পথ অনুসরণ করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সংকল্প ছিল সাঈদ খোকনের। সেই অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে সরকারি দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন সাঈদ খোকন। তরুণ এই প্রার্থীও তরুণ ভোটারদের কাছাকাছি থাকতে অনলাইনের ভার্চুয়াল জগতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং তাতে সাড়াও পাচ্ছেন। তার নিজস্ব ওয়েবসাইট (www.sayeedkhokon.com) ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণা। তার নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে ফেসবুকের সাঈদ খোকন ফ্যানক্লাব (www.facebook.com/SayeedKhokonFanClub)। এই পেজটিতে যুক্ত রয়েছে ১ লক্ষ ৭ হাজারেরও বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী। আর তাদের কাছে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছেন সাঈদ খোকন তার নির্বাচনী ইশতেহার, নির্বাচনী প্রচারণার খবরাখবর এবং নিজের বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য নিয়ে। এ ছাড়াও তার নামে আরও বেশকিছু ফেসবুক পেজ এবং অ্যাকাউন্টও নির্বাচনী প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সবমিলিয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রধান প্রধান প্রার্থীদের মনোযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে অনলাইন—এ কথা বলাই যায়। রাস্তায় বা বাড়িতে বাড়িতে শারীরিকভাবে নির্বাচনী জনসংযোগের পাশাপাশি এখন তারা অনলাইনে ভার্চুয়াল জনসংযোগেও মনোযোগী হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে তরুণদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হলে এর যে বিকল্প নেই, তা শীর্ষ এসব প্রার্থীরা সহজেই বুঝে গেছেন। প্রযুক্তির সাথে আমাদের সম্পর্কের মেলবন্ধন হয়তো এভাবেই দিনকে দিন বাড়তেই থাকবে।