বিশ্বকাপে তাদের কেউ অল আউট করতে পারেনি, উল্টো তারাই এক এক করে ৭ প্রতিপক্ষকে  করেছে অল আউট-এ নিয়ে কি গর্বই না ছিল ভারতের! বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা ভারতকে যে এ বছরের শুরুতে চিবিয়ে খেয়েছে অস্ট্রেলিয়া, তা আমলে আনেনি ভারত। সিডনীতে ৩৫ বছরের অতীতের হেড টু হেড এ অস্ট্রেলিয়ার ১২ জয়ের বিপরীতে তাদের জয় মাত্র ১টিÑ সেটাও বেমালুম ভুলে গিয়েছিল ভারত। সেমিফাইনালে হারের অতীত নেই অস্ট্রেলিয়ার, এটাও যে মাথায় আনেনি ধোনীর দল। কোয়ার্টার ফাইনালের হার্ডল পেরুতে বাংলাদেশের বিপক্ষে আম্পায়ারিংয়ের ফেভার পেতে হয় যাদের, তাদের আসল শিক্ষাটা দিয়েই ছেড়েছে মাইকেল ক্লার্ক এন্ড কোং। স্মিথের সেঞ্চুরিতে (১০৫) ভারতকে রান পাহাড়ে চাপা দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেমিফাইনালে রেকর্ড স্কোরকে (৩২৮/৭) মøান হতে দেয়নি অস্ট্রেলিয়া, একতরফা ম্যাচে ৯৫ রানে জিতে এক আসর পর ফাইনালে ক্রিকেট পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া। ২০১১ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হারের বদলাও যে নিতে পেরেছে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপের স্বাগতিক সুবিধা নিয়ে সর্বশেষ আসরে ফাইনালিস্ট যৌথ স্বাগতিক ভারত, শ্রীলংকাÑএবার সেখানে মেলবোর্নে ট্রফির লড়াইয়ে দুই স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড। সিডনীর ফ্লাট উইকেটে সাড়ে তিনশ’ও নাকি মামুলি! অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং দেখে ইনিংসের মাঝপথে এমন মন্তব্য করে ভারত সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন ব্রেট লি। তার এমন মন্তব্যে টনিক নিয়ে ইনিংসের শুরুটা অবশ্য জমিয়ে দিয়েছিল ভারত ওপেনিং পার্টনারশিপ। তবে ৭৭ বলে ৭৬ রানের ওই পার্টনারশিপ বাদ দিলে রণে ভঙ্গই দিয়েছে ভারত। জনসনের বাউন্সারের জবাব হুক করতে যেয়ে কোহলীর স্কাই ক্যাচের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসই যেনো হারিয়েছে ভারত। মাঝপথেই ভারতকে ম্যাচ থেকে ছিটকে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়া। শেষ ৯০ বলে ১৫৯ রানের টার্গেট কিংবা শেষ ৬০ বলে ১৩৩Ñসাধ্যের বাইরেই যেনো ছিল ভারতের। লড়াইটা চালিয়েছিলেন একা অধিনায়ক ধোনী। অধিনায়ক হিসেবে ব্যাটিং করে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে অজি পন্টিং (৮৪৯৭), কিউই স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের (৬২৯৫) এরপর গতকাল ৬৫ রানের ইনিংসে তৃতীয় অধিনায়ক হিসেবে দেখা পেলেন ৬ হাজারের (৬০২২)। তবে ম্যাক্সওয়েলের সরাসরি এক থ্রোতে ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়কের রাজদ-টা থেকে গেল ছুটে! সেমিফাইনালের আগে আলোচনায় ভারতের বোলিং কম্বিনেশনকে অস্ট্রেলিয়ার ভারতের দর্প চূর্ণচেয়ে এগিয়ে রেখেছিলেন যারা, বড্ড ভুল করেছেন তারা। অতি উৎসাহী হয়ে ভারতের পক্ষ নিয়ে ভারতের পেস এ্যাটাককে অস্ট্রেলিয়ার উপরে রেখেছেন যারা, তারাও করেছেন ভুল।  সেমিফাইনালে ভারতের তিন পেস বোলারের খরচা যেখানে ২২০ রান, সেখানে অস্ট্রেলিয়ার ৪ পেস বোলারের রান খরচার সমষ্টি ১৭৬! যার ফিফটি মানেই অস্ট্রেলিয়ার জয়, কুসংস্কারে বিশ্বাসীদের মধ্যাহ্ন বিরতিতেই তাই আগাম সুখবর দিয়েছিলেন  স্টিভেন স্মিথ। বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক সেঞ্চুরিটি (১০৫) তার ভারতের বিপক্ষেও প্রথম এবং সেই ইনিংসের সৌরভে সুরভিত সিডনী। হোমে সংখ্যালঘু, তাতে কিÑ সিডনী ক্রিকেট গ্রাউন্ডে গতকাল উপস্থিত এক-তৃতীয়াংশ অজিকে যথার্থই বিনোদন দিয়েছেন স্মিথ। পন্টিংয়ের যোগ্য উত্তরসূরি ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৪র্থ সেঞ্চুরিতে খেলেছেন ৮৯টি বল। ৮৬ থেকে সেঞ্চুরিÑ এই ১৪ রানে লেগেছে তার মাত্র ৩টি বল। পাওয়ার প্লে’র প্রথম ওভারের ৪র্থ বলে সামীকে ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারি শটে ৮৬ থেকে ৯০, পঞ্চম বলে মিড উইকেট দিয়ে দর্শনীয় ছক্কায় ৯০ থেকে ৯৬, পরের বলেই সেঞ্চুরির শট, ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারি। মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩৫’র পর বলার মতো স্কোর ছিল না অ্যারন ফিঞ্চ-এর। তবে ১১৬ বলে ৮১ রানের সময়োচিত ইনিংসে নিজের অপরিহার্যতার জানানই দিতে পেরেছেন তিনি। স্মিথের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়ায় দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ১৮২Ñসেমিফাইনালে ভারতকে রান পাহাড়ে চাপা দিতে পেরেছে অস্ট্রেলিয়া এখানেই। বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইতিহাসে সেমিফাইনালে ৩শ’ স্কোর এটাই প্রথম। ৩২৮/৭ স্কোরে নতুন ইতিহাসটাও রচনা করলো অস্ট্রেলিয়া। সিডনীতে তিনশ’ চেজের অতীত ছিল না কারো, ৩১৮’র পেছনে একবার ছুটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৯৯ পর্যন্ত ইনিংস টেনে নিতে পারার অতীত আছে ভারতের। সেখানে এই ম্যাচে স্কোরটা টেনে নিয়েছে তারা ২৩৩ পর্যন্ত! বিশ্বকাপ ইতিহাসে নক আউট পর্বে ভারত বোলারদের মধ্যে একমাত্র ৪ উইকেটের পরও উমেষ যাদবের কৃতিত্ব (৪/৭২) মøান করেছে অস্ট্রেলিয়ার এক পেস বোলার ফকনার (৩/৫৯)। এই নিয়ে আশউইনের শিকার ৭ বার হয়েছেন ম্যাক্সওয়েল, সেটা অবশ্য ব্যক্তিগত জুজুই হয়ে থেকেছে। সেমিফাইনালের টিকিট মানেই ফাইনাল তাদের অবধারিত, বিশ্বকাপ ইতিহাসে ৬ষ্ঠ বারের মতো সেই রেকর্ডটি যুক্ত হলো অস্ট্রেলিয়ার। ৯২’এ স্বাগতিক হয়েও অ্যালান বোর্ডারদের দুঃখ ঘুঁচতে বাকি মাত্র ১টি হার্ডল। জানেন, বাংলাদেশকে হারিয়ে অধিনায়ক ধোনী পেয়েছিলেন শততম ওয়ানডে জয়ের স্বাদ, আর মাত্র ১টি হার্ডল পেরুলে  শিরোপা উৎসবের সঙ্গে  মাইকেল ক্লার্ক হবেন অর্ধশত ম্যাচ জয়ী ভাগ্যবান অধিনায়ক! এই আসর থেকে কি ক্রিকেট বিশ্ব পাবে নতুন চ্যাম্পিয়ন (নিউজিল্যান্ড), না শিরোপার রেকর্ড আরো ভারী করে ৫ম ট্রফির স্বাদ পাবে অস্ট্রেলিয়া? সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী ২৯ মার্চ। আম্পায়ারিংয়ের পক্ষপাতিতে কোয়ার্টার ফাইনাল বিদায় নিয়েও বাংলাদেশের সান্ত¦না একটাই, এই গ্রুপের ২টি দলই (অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড) যে ফাইনালিস্ট! ফাইনাল তারিখ    ম্যাচ    ভেন্যু    বাংলাদেশ সময় ২৯ মার্চ    অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড    মেলবোর্ন    সকাল সাড়ে ৯টা

সুত্র :Daily Inqilab