১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর। ব্লাকবার্ন রোভার্সের বিপক্ষে মাঠে নামলেন ১৮ বছর বয়সী তরুণ স্টিভেন জেরার্ড। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১৬ বছর। বয়সও বেড়েছে। বিদায় রাগিনী বাজায় সময় হয়ে গেছে। ইংলিশ ক্লাবটির হয়ে শনিবার লিভারপুলের হয়ে নিজের শেষ ম্যাচ খেলতে নামবেন ইংল্যান্ডের সাবেক এই অধিনায়ক।

লিভারপুলের হয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য ট্রফি জেতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ব্যক্তিগত অ্যাওয়ার্ডও জিতেছেন স্টিভেন জেরার্ড। অল রেডদের হয়ে এই ইংলিশ মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

লিভারপুলের হয়ে অভিষেক: ১৯৯৮ সালেল ২৯ নভেম্বর ব্লাকবার্ন রোভার্সের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের খেলা চলাকালীন ভেগার্ড হেগেমের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ১৮ বছর বয়সী স্টিভেন জেরার্ড। ম্যাচটিতে ২-০ ব্যবধানে জয় পায় অল রেডরা। লিভারপুলের খুব কম ভক্তই বুঝতে পেরেছেন, ক্লাবের হয়ে এক দুর্দান্ত খেলোয়াড়ের আগমনী বার্তা শুরু হয়েছে।

ব্রেক-থ্রু: ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে মাত্রই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে আর্সেনালকে হারিয়েছেন স্টিভেন জেরার্ড। আর্সেনাল তারকা থিয়েরি অঁরি পেট্রিক ভিয়েরাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মিডফিল্ড দাপিয়ে বেড়ানো ছোকরাটা কে? লিভারপুলের হয়ে সেই যে আলোতে আসেন জেরার্ড, গোটা ক্যারিয়ার-জুড়ে সেই আলোটা ধরে রাখেন এই ইংলিশ তারকা।

শিরোপা, গোল ও অ্যাওয়ার্ড: ২০০০-২০০১ মৌসুমে ২৮ নম্বর জার্সির পরিবর্তে ১৭ নম্বর জার্সি দেয়া হয় স্টিভেন জেরার্ডকে। মৌসুমটি অসাধারণ কাটে লিভারপুল ও জেরার্ডের। এফএ কাপ, লিগ কাপ ও উয়েফা কাপ জয় করে জেরার্ডের দল। সেবার লিগ কাপের ফাইনালে ৪-৩ গোলে জয় পাওয়া ম্যাচে দলে হয়ে এক গোল করেন তিনি।

২০০০-০১ মৌসুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে প্রফেশনাল ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) বর্ষসেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন স্টিভেন জেরার্ড। পাশাপাশি পিএফএ ফান প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার এবং পিএফএ’র বর্ষসেরা দলে জায়গা পান তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু: ২০০১ সালে উয়েফা সুপার কাপ জেতার পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত খেলা উপহার দেয় জেরার্ডের লিভারপুল। সেবার রানার্স-আপ হয়ে মৌসুম শেষ করে অল রেডরা। প্রায় এক যুগ পর রানার্স আপ হওয়ার স্বাদ পায় আনফিল্ডের দলটি।

অল রেডদের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে জাতীয় দলে ডাক পান এই ইংলিশ মিডফিল্ডার। নিজের অভিষেক ম্যাচে এক গোল করে জার্মানির বিপক্ষে দলকে ৫-১ গোলের ব্যবধানে বড় জয় এনে দেন জেরার্ড।

অল রেড অধিনায়ক নির্বাচিত: ২০০২-০৩ মৌসুমে নিয়মিত অধিনায়ক স্যামি হাইপিয়া’র ফর্মহীনতার ফলে লিভারপুলের অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড পান স্টিভেন জেরার্ড।

সে সময়কার কোচ জেরার্ড হুলিয়ার বলেন, ‘এখন তার বয়স মাত্র ২৩ হলেও সে অধিনায়কত্বের জন্য সে প্রস্তুত। তার খেলা ও ব্যক্তিত্বে পরিপূর্ণতার ছাপ রয়েছে। তাই তাকে অধিনায়ক করা হয়েছে।’

প্রথম সংশয়: ২০০৩-০৪ মৌসুম শেষে স্টিভেন জেরার্ড বলেন, ‘এই প্রথমবারের মতো আমি লিভারপুলের ছাড়ার চিন্তা-ভাবনা করি। সেবার রাফায়েল বেনিতেজ কোচ হিসেবে আনফিল্ডে আসার পর চেলসি জেরার্ডকে বড় অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখায়। যদিও শেষ পর্ন্ত আনফিল্ডেই থাকেন তিনি।

ইস্তাম্বুলের আলো ঝলমলে রাত: লিভারপুলের হয়ে ক্যারিয়ারের স্বর্ণালি সময় কাটান ২০০৪-০৫ মৌসুমে। প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বাদ পান স্টিভেন জেরার্ড। ইস্তাম্বুলের ফাইনালে প্রথমার্ধেই মিলানের বিপক্ষে ৩-০ গোলে পিছিয়ে যায়। সবাই যখন লিভারপুলের পরাজয়ের জন্য প্রহর গুনছিল ঠিক সেই সময়ই জেগে উঠেন স্টিভেন জেরার্ডরা।

দুর্দান্ত এক কাম-ব্যাকের নজির গড়ে মাত্র ৬ মিনিটের স্পেলে ৩ গোল করে খেলায় সমতায় ফেরান জেরার্ডরা। জেরার্ড এক গোল করার পাশাপাশি একটি গোলে অ্যাসিস্ট করেন। নির্ধারিত সময়ের খেলা ৩-৩ এ শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের খেলাতে কোনো গোল না হলে ম্যাচ পেনাল্টি শ্যুট-আউটে গড়ায়। আন্দ্রে শেভচেঙ্কোর শট লিভারপুল গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দিয়ে অল রেডদের ইউরোপ-সেরার মুকুট এনে দেন।

ফাইনালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে লিভারপুলের আসল নায়ক বনে যান স্টিভেন জেরার্ড। অসাধরণ পারফনম্যান্সের জন্য ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি।

ফাইনাল-সেরা জেরার্ড: এক বছর পর ফের নায়কের আসনে বসেন স্টিভেন জেরার্ড। এবার এফএ কাপের ফাইনালে জোড়া গোল করে দলকে শিরোপা উপহার দেন তিনি। ওয়েস্ট হ্যামের বিপক্ষে প্রথমার্ধের শুরুতে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর প্রথমার্ধের শেষ মুহুর্তে ব্যবধান কমায় লিভারপুল।

দ্বিতীয়ার্ধে লিভারপুলকে সমতায় ফেরান ইংলিশ মিডফিল্ডার স্টিভেন জেরার্ড। ১০ মিনিট পর ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ওয়েস্ট হ্যাম। এবারও দলকে উদ্ধার করেন জেরার্ড। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার একটু আগে দলকে সমতায় ফেরান তিনি।

নির্ধারিত সময়ের খেলা ৩-৩ গোলে ড্র থাকায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়ায় ম্যাচ। ৩০ মিনিটের খেলার কোনো দল গোল করতে না পারায় টাইব্রেকারে গড়ায় ম্যাচ। পেনাল্টি শ্যুটআউটে ওয়েস্ট হ্যামকে হারিয়ে শিরোপা জয় করে অল রেডরা।

আগের মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের মতো এফএ কাপের ফাইনালেও ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার পান জেরার্ড।

হারের বেদনা: ২০০৬-০৭ সালে লিগে তৃতীয় স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করে লিভারপুল। দুই বছর আগে এসি মিলানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জয় করেছিল লিভারপুল। দুই বছর পর গ্রিসের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে জেরার্ডের দলকে কাঁদিয়ে ইউরোপ-সেরার মুকুট জয় করে ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। ফাইনালে হারলেও আট বছরে পঞ্চমবারের মতো পিএফএ’র বর্ষসেরা দলে জায়গা করে নেন এই মিডফিল্ডার।

পিএফএ বর্ষসেরা: ২০০৭-০৮ মৌসুমে পিএফএ’র বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন স্টিভেন জেরার্ড। এই অ্যাওয়ার্ড ফার্নান্দো তোরেসের সঙ্গে যৌথভাবে জিতেন তিনি। একই বছর ‘অর্ডার অব দ্য বৃটিশ এম্পায়ার’র সদস্য হন এই সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক।

শিরোপার সুযোগ হাতছাড়া: ২০০৮-০৯ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের খুব কাছাকাছি চলে যায় লিভারপুল। তবে মৌসুমের শেষদিকে অনুজ্জ্বল পারফরম্যান্সের কারণে চার পয়েন্ট পেছনে থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে শিরোপা হাতছাড়া করে অল রেডরা।

২০০৯ সালের মার্চে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্টিক করেন স্টিভেন জেরার্ড। সেবার ফুটবল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’র বর্ষসেরা খেলোয়াড়েরর পুরস্কার জিতেন এই ইংলিশ মিডফিল্ডার।

নতুন মাইলফলক: ২০০৯-১০ মৌসুমে ২৯ বছর বয়সী জেরার্ড মাত্র ১৩তম খেলোয়াড় হিসেবে লিভারপুলের হয়ে ৫০০ ম্যাচ খেলার রেকর্ড স্পর্শ করেন।

জাতীয় দলের অধিনায়ক: ২০১০ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হন স্টিভেন জেরার্ড।

ফের শিরোপায় হাত: দীর্ঘ ৬ মৌসুম পর ২০১১-১২ মৌসুমে ফের লিভারপুলের হয়ে শিরোপার স্বাদ পেলেন স্টিভেন জেরার্ড। সেবার লিগ কাপের শিরোপা জয় করে জেরার্ডের দল। এভারটনের বিপক্ষে সেই বছর লিভারপুলের হয়ে প্রিমিয়ার লিগের ৪০০তম ম্যাচকে হ্যাটট্টিক করে স্মরণীয় করে রাখেন।

শিরোপা কাছাকাছি, তবু কতো দূর: ২০১৩-১৪ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল স্টিভেন জেরার্ডের লিভারপুল। কিন্তু মৌসুমের শেষ চার ম্যাচে অল রেডদের বাজে পারফরম্যান্স ও ম্যান সিটির দারুণ কাম-ব্যাক লিভারপুলের হয়ে জেরার্ডকে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিততে দেয়নি। মৌসুমের শেষ তিন মাসকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময় বলে আখ্যায়িত করেছেন এই ইংলিশ মিডফিল্ডার।

চূড়ান্ত অধ্যায়: চলতি বছরের মার্চে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেই মাত্র ৩৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন স্টিভেন জেরার্ড। এক মাস পর কিউপিআর’র বিপক্ষে দলের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন তিনি।

শনিবার ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে লিভারপুলের হয়ে সর্বশেষ ম্যাচ খেলবেন স্টিভেন জেরার্ড। এরপর মেজর সকার লিগে লস অ্যাঞ্জেলস গ্যালাক্সির হয়ে খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাবেন এই ইংলিশ তারকা।

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য ট্রফি জিতলেও প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিততে না পারার বেদনা নিয়েই আনফিল্ড ছাড়তে হবে এই ইংলিশ মিডফিল্ডারকে।