দানব কথাটি শুনে নিশ্চয় কল্পনা রাজ্যের কোন লম্বা দাঁত ওয়ালা হিংস্র কিম্ভূত কিমাকার প্রানির কথা চিন্তায় ভেসে উঠে । কিন্তু এই দানব সেই দানব নয় ,এই দানব হচ্ছে নক্ষত্র দানব । আমরা যে জগতে বসবাস করি  সেই জগত বিরামহীন গতি আর বিশ্রামহীন পরিবর্তনের ধারায় ছুটে চলছে। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি ও ধংসের লীলা খেলাই জগতের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম । তারকা জগতেও চলছে একই নিয়ম ।

বিজ্ঞানীদের মতে, যেসব নক্ষত্র বয়েসে প্রবীণ, তারা কোনো এক সময় স্ফীত হতে থাকে। ফলে এক সময় তাদের আয়তন বাড়তে শুরু করে অস্বাভাবিক মাত্রায়। এভাবে এক সময় তাদের আয়তন হয়ে যায় লাল রঙের বিরাট একটা দৈত্যের মতো। এসময় তাদের নক্ষত্রের মতো বৈশিষ্ট্যটা আর থাকে না। বিজ্ঞানীরা লাল রঙের এই অতিকায় গোলকের নাম দিয়েছেন রেড জায়ান্ট বা লাল দৈত্য বা লোহিত দানব।

বিজ্ঞানীরা মৌলিক পদার্থগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসেছেন। বিশেষ করে তাদের জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে। এক সময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া বাকি সব মৌলিক পদার্থ তৈরি হয়েছে নক্ষত্রগুলোর ভেতরেই। সুপারনোভা বিস্ফোরণের উদাহরণ টেনেছেন তাঁরা। এই বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের ভেতর সৃষ্টি হয় অকল্পনীয় মাত্রায় তাপ ও চাপ। এই বিরাট চাপ ও তাপশক্তির কারণেই সেখানে অনবরত নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হচ্ছে। ফিউশন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রের ভেতরে মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসগুলো পরস্পরের যুক্ত হয়ে তৈরি করে নতুন নতুন মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াস। এই ব্যাপারটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে নিউক্লিওসিনথেসিস। বিজ্ঞানী সম্প্রতি লাল দৈত্যের ভেতরেও নিউক্লিওসিনথেসিস লক্ষ্য করেছেন।

মাঝে মাঝে লাল দৈত্যের গভীরতম অঞ্চল থেকে নির্গত হয় গ্যাস। সেই গ্যাসে কার্বন এবং নানা রকম উদ্ভট ধরনের মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এদের মধ্যে কিছু কিছু নিউক্লিয়াস একেবারে বিরল মৌলের। উদাহরণ বলা যায় টেকনেসিয়াম। এই মৌলটির কোনো স্থিতিশীল অতেজস্ক্রিয় আইসোটোপ নেই। এর তেজস্ক্রিয়তার অর্ধায়ু মোটামুটি বিশ লক্ষ বছর। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, যেসব লাল দৈতে এই টেকনেসিয়ামের দেখা মিলেছে, তাদের বয়স হাজার কোটি বছরের মতো। সুতারাং বলায় যায়, ওইসব নক্ষত্রগুলোর যখন জন্ম হয়, তখন সেগুলোতে টেকনেসিয়ামের অস্তিত্ব ছিল না। টেকনেসিয়ামের জন্ম হয়েছিল অনেক পরে। তা না হয়ে যদি নক্ষত্রগুলোর জন্মের সময় এই মৌল সৃষ্টি হতো, লাল দৈত্যের পৃষ্ঠের দিকে যেসব গ্যাস আছে তাতেও টেকনেসিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া যেতএ ধরনের ব্যাপা র লক্ষ করেই বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, লাল দৈত্যের মৌলিক পদার্থ তৈরির ক্ষমতা আছে।
আগেই বলা বলা হয়েছে, লাল দৈত্য আসলে প্রবীণ নক্ষত্র। এরা জীবনের শেষ সীমার কাছে পৌঁছে গেছে। এখন চলছে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার দিকে পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিল মহাজাগতিক মেঘ। হাইড্রোজেনের মেঘ। সেসেব মেঘ মহাকর্ষ বলের আকর্ষণের প্রভাবে প্রথমে পুঞ্জিভূত হতে শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে। ফলে পুঞ্জিভূত হাইড্রোজনের ঘনত্ব এবং তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। একসময় তাপমাত্রা এমন অবস্থায় আসে, যখন এর প্রভাবে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলো পরস্পর যুক্ত হতে শুরু করে। এভাবে দুটো হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস যুক্ত হয়ে হিরিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। এভাবে হাইড্রোজেন পুঞ্জিভূত হয়ে তৈরি করে ফেলে বিরাট বিরাট সব নক্ষত্র। নিউক্লিয়ার ফিউশনের ফলে গ্যাস নিউক্লিয়াসগুলো যুক্ত হওয়ার সময় বিরটা পরিমাণ তাপশক্তি নির্গত হয়। এই কারণে হাইড্রোজেনের যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে হাইড্রোজেনের প্রজ্বলনও বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাজাগতিক গ্যাস সংকুচিত হয়ে আমাদের সূর্যের নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে হতে সময় লেগেছিল প্রায় তিন কোটি বছর।