বিশ্বজুড়ে সংবাদ মাধ্যমে যখন উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে ঠিক তখনই পরমাণু হামলা চালাতে প্রস্তুত বলে হুমকি দিয়েছেন দেশটির নেতা কিম জং উন। যুক্তরাষ্ট্রকে উস্কানিমূলক পদক্ষেপ না নিতে সতর্ক করেছেন তিনি। গতকাল শনিবার উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সাং এর ১০৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন কিম জং উন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা করছে চীন। খবর বিবিসি ও সিএনএনের।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তা চো রেয়ং হায়ে বলেছেন, যেকোনো পরমাণু হামলার বিপরীতে আমরা আমাদের নিজস্ব কায়াদায় পাল্টা পরমাণু আঘাত করবার জন্য প্রস্তুত। গতকাল পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত কুচকাওয়াজে ট্যাংক এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের বড় ধরনের প্রদর্শনী করা হয় নিজেদের বর্তমান সামরিক শক্তি তুলে ধরবার জন্য। ওই সামরিক প্রদর্শনীতে সাবমেরিন থেকে উেক্ষপণযোগ্য ব্যালাস্টিক মিসাইল প্রথমবারের মত জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। বিশ্বের যেকোনো জায়গায় লক্ষ্যবস্তুকে টার্গেট করার উদ্দেশ্যে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার সম্ভব। উত্তর কোরীয় যুদ্ধবিমান আকাশে ১০৫ সংখ্যাটি ফুটিয়ে তোলে। এই মিসাইলের পাল্লা ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরো দু’টি নতুন আন্ত:মহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র ও প্রথাগত লাঞ্চারসহ কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত হয়।

গত এক বছর ধরে সব দেশের চোখ রাঙানিকে উড়িয়ে দিয়ে একতরফাভাবে পরপর পরমাণু বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছেন স্বৈরাচারী কিম। মহাশক্তিধর প্রতিবেশি চীনও তাকে সংযত করতে পারেনি। উত্তর কোরিয়াকে দমন করার হুংকার ছাড়তেই ফের ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়েন কিম। বুঝিয়ে দেন, আমেরিকাকে থোড়াই কেয়ার করেন তিনি। সমপ্রতি দেশের পূর্ব উপকূলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালান তিনি। ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপান সাগরে আঘাত হানে। এটি কেএন-১৫ মডেলের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার নিন্দা জানায়। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ১৮৯ কিলোমিটার পর্যন্ত যে কোরো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

যুদ্ধের আশঙ্কা চীনের

শুক্রবার চীনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আর ‘যুদ্ধ’ লেগে গেলে কোনো পক্ষই তাতে জয়ী হবে না বলেও উল্লেখ করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সরাসরি যুদ্ধ না বললেও সেরকম আশঙ্কাই করছে চীন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। মনে হচ্ছে যে কোন সময় একটা সংঘাত দেখা দেবে। তিনি উত্তেজনাকর ও উস্কানিমূলক হুমকি দেয়া থেকে বিরত থাকার জন্যও সব পক্ষের প্রতি আহবান জানান। মূলত উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তাগুলো থেকেই যুদ্ধের ইঙ্গিত পাচ্ছে চীন। কোরীয় উপত্যকায় আরেকটি পরমাণু পরীক্ষার প্রস্তুতির জের ধরে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সামপ্রতিক সময়ে ক্ষেপণাস্ত্রসহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। এর আগে জাপান সাগরে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর যুক্তরাষ্ট্র বলেছিলো উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে তারা একাই ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। সর্বশেষ এখন পরমাণু পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নৌবাহিনীর জাহাজ কোরীয় উপত্যকায় অবস্থান নেয়ার পর সোচ্চার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর তারই জের ধরে ওই অঞ্চলে এখন যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখছে চীন, যে দেশটি দীর্ঘকাল ধরে উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে সমপ্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইট বার্তায় বলেছেন একা ব্যবস্থা নিতে যুক্তরাষ্ট্র ভীত নয়। তিনি বলেন, চীন সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিলে ভালো। নাহলে তাদের ছাড়াই আমরা সমস্যার সমাধান করবো। ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন হচ্ছে কারণ তারা ভাবছে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করছে। এদিকে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন ট্রাম্প। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, আরো কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পটভূমিতে ধারণা করা হচ্ছে শনিবার ষষ্ঠবারের মতো পরমাণু বোমার বা আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাতে পারে উত্তর কোরিয়া। তবে উত্তর কোরিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন উত্তর কোরিয়ার প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িত একটি প্রতিষ্ঠান যে কোনো সময় পরমাণু যুদ্ধ হতে পারে সতর্ক করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা

সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেস এর সিনিয়র ফেলো অ্যাডাম মাউন্ট বলেন, শনিবারের সামরিক সরঞ্জামের প্রদর্শণীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও হামলা চালাতে সক্ষম এবং সেটাই তাদের উদ্দেশ্য। ক্যালিফোর্নিয়ার জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্স অ্যাসোসিয়েট মেলিসা হ্যানহাম বলেন, ভূমি এবং যুদ্ধবিমান থেকে উেক্ষপনযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র প্রদর্শণ করেছে উত্তর কোরিয়া। ভূমি থেকে উেক্ষপনযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র কেএন-১৫ নামে পরিচিত। আর যুদ্ধবিমান থেকে উেক্ষপনযোগ্য ক্ষেপনাস্ত্র কেএন-১১ নামে পরিচিত। কেএন-১৫ ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে গোপনে এবং সহজেই হামলা চালানো সম্ভব।