ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ নির্বাচন। তিনটি নির্বাচনই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হলেও নানা কারণে এর প্রভাব পড়বে জাতীয় রাজনীতির ওপর, যা দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তারা আরও মনে করেন, এ নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। অগ্নিপরীক্ষা সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কারণ এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দূর হয়েছে দেশের তিন মাসের ভয়ংকর অস্থিরতা। রাজনীতির সুস্থধারায় ফিরে যাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রবল প্রত্যাশা।

ঢাকার মানুষ দীর্ঘদিন পর নগর পিতা পেতে যাচ্ছেন। অবসান হতে যাচ্ছে আমলাদের রাজত্ব। নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। অন্যদিকে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। আর সরকার বলছে, আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গ্রহণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা।

তবে সাধারণ ও নিরীহ ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে, আর বিধি মোতাবেক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্বাচনের ফল ঘোষণা হলেই কেটে যাবে সংশয়। প্রশংসিত হবে ইসি ও সরকারের যাবতীয় পদক্ষেপের। সবার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে শুরু হবে গণতন্ত্র সুরক্ষার নতুন যাত্রা। নির্বাচনী প্রচারণায় দুই দলের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ইঙ্গিত দিচ্ছে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তা প্রমাণে মরিয়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

বিএনপিসহ তাদের মিত্ররা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও তিন সিটি নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল সমর্থিত প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাদের তৎপরতা ও প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচারণায় ভোটারদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনী আমেজ। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে পারেননি বিএনপি সমর্থিত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী। তাদের ওপর পুলিশি হয়রানি করা হয়েছে এবং এখনও সেটি অব্যাহত রয়েছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও তারা সরে দাঁড়াননি। তাদের স্ত্রীসহ নিকট-আত্মীয়স্বজন ও নেতাকর্মীদের মাধ্যমে অব্যাহত রেখেছিলেন প্রচার।

তিন সিটিতে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ করা হবে। এ উপলক্ষে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটিতে রেকর্ডসংখ্যক ৪৮ জন মেয়র প্রার্থীসহ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ১ হাজার ১৮৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্পর্শকাতর বিবেচনায় এ নির্বাচনে তিন সিটিতে অতীতের তুলনায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনী এলাকায় টহল দিচ্ছে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর প্রায় ৮০ হাজার সদস্য। ক্যান্টনমেন্টে প্রস্তুত রয়েছে তিন ব্যাটালিয়ন সেনা সদস্য। নির্বাচনী পরিস্থিতির অবনতি হলে রিটার্নিং কর্মকর্তার ডাকে ম্যাজিস্ট্রেটদের সহায়তায় পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন সেনা সদস্যরা। পাশাপাশি মাঠে রয়েছেন প্রায় পাঁচশ’ জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের বিশাল কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্বাচনী কেন্দ্রে নিরাপদে মালামাল পৌঁছে গেছে। নির্বিঘ্নে প্রছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সিইসি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য ও পক্ষপাতিত্ব বরদাশত করবে না কমিশন। প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আইন মেনে চলুন। আইন ভঙ্গ করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে।

নির্বাচন পরিস্থিতি ও কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রথম থেকে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠে। মামলা জর্জরিত বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত বেশিরভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী ও সমর্থকরা গ্রেফতার আতংকে মাঠে নামতে পারেননি। খালেদা জিয়ার ওপর কয়েক দফা হামলা আতংকের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস ১ দিনের জন্যও প্রচারণা চালাতে পারেননি। আত্মগোপনে থেকেই প্রচারণা চালিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। এ সময়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর গ্রেফতার অভিযান বিরোধী শিবিরে নতুন আতংক ছড়িয়ে দেয়। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচারণা চালিয়েছেন। এ নিয়ে নির্বাচনে কমিশনের কাছে বারবার আবেদন করেও বিএনপি সমর্থিতরা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ পাননি বলে অভিযোগ করেন। নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মাহী বি চৌধুরী, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ মনজুর আলমসহ কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থীর ওপর হামলা আতংকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া নির্বাচনে তিন ব্যাটালিয়ন সেনা মোতায়েনে চিঠি দেয়ার ১ দিন পরই ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সেনা সদস্যদের ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করার নির্দেশ দিয়ে দ্বিতীয়বার চিঠি দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে কমিশন। এ ঘটনায় ইসির নিরপেক্ষতা ও সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন তোলে বিভিন্ন মহল।

যদিও সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সোমবার দাবি করেছেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করেছে ইসি। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে প্রার্থীদের প্রচারণা তা প্রমাণ করেছে। তবে যে যে কয়টা ভুল হয়েছে, তা ছোটাখাটো। আমরাও চেষ্টা করছি যেন সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে।

এদিকে ইসি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এ বিবেচনায় এ নির্বাচনে অতীতের নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিন সিটিতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ সব মিলিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর ৭৮ হাজার ৭৩০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের শতাধিক বিদেশী পর্যবেক্ষক এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। এছাড়াও দেশীয় তিন হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক থাকছেন নির্বাচনে।

তবে বিপুলসংখ্যক আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরও নির্বিঘ্নে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাতে পারছেন না বিএনপি সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্র্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীনরা ভয় দেখিয়ে বিরোধী মতের প্রার্থীদের সমর্থকদের এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। এমনকি পোলিং এজেন্টদের ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। এসব কারণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা পোলিং এজেন্ট সংকটে ভুগছে। যদিও বিএনপি দাবি করেছে, ভোট কেন্দ্র পাহারা দেবেন তারা। নির্বাচনে কারচুপি হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

৬০ লাখের বেশি ভোটার অধ্যুষিত তিন সিটিতে এবার রেকর্ডসংখ্যক এক হাজার ১৮৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৪৮, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৮৯১ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৪৯ জন প্রার্থী হয়েছেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বেশিরভাগ দল মেয়র পদে প্রার্থী সমর্থন দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থনে ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে আনিসুল হক (টেবিল ঘড়ি), দক্ষিণে সাঈদ খোকন (ইলিশ মাছ) ও চট্টগ্রামে আ জ ম নাছির উদ্দীন (হাতি) এবং বিএনপির সমর্থনে ঢাকা উত্তরে তাবিথ আউয়াল (বাস), দক্ষিণে মির্জা আব্বাস (মগ) ও চট্টগ্রামে মোহাম্মদ মনজুর আলম (কমলালেবু) প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ঢাকা উত্তরে বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল (চরকা), দক্ষিণে হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন (সোফা) ও চট্টগ্রামে মো. সোলায়মান আলম শেঠকে (ডিশ এন্টেনা) দলীয় সমর্থন দিয়েছে। একইভাবে কাউন্সিলর পদেও প্রার্থী সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে তিন সিটিতে আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সোমবার রাতে বলেন, তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ হবে এ প্রত্যাশা সরকারসহ সবার। এটা আগামী রাজনীতির জন্য ভালো হবে। তা না হলে ‘ব্যাড ইফেক্ট’ পড়বে সরকারের ওপর। যে সংকট থেকে আমরা বের হয়ে এসেছি, তার মধ্যে গিয়ে আবার পড়ার আশংকা থেকেই যাবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আমাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। কারণ এ নির্বাচনে যথেষ্ট বিদেশী পর্যবেক্ষক রয়েছেন।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সোমবার টুইটারে লিখেছেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই শক্তিশালী গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় বিষয়। আশা করি, আগামীকালের (আজ) নির্বাচন হবে সেই চেতনার দৃষ্টান্ত।’

সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, নির্বাচনে কারচুপি করা হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তার দাবি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয় পাবেন বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা।

তবে এ ধরনের অভিযোগ নাকচ করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে মিথ্যাচার করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আমু দাবি করেন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন করতে এ সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

এক যুগ পর ঢাকা সিটি নির্বাচন : প্রায় এক যুগ পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছিল। ওই সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৭ সালের ১৪ মে। ওই সময়ে নানান জটিলতায় নির্বাচন হয়নি। ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ডিসিসিকে উত্তর ও দক্ষিণ এ দুই ভাগে বিভক্ত করা হলে মেয়র পদ হারান বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা। এরপর থেকে প্রশাসকরা চলাচ্ছেন দুই সিটি কর্পোরেশন। ওই সময়ে অবিভক্ত ঢাকা সিটিতে ২০ মেয়র প্রার্থীসহ মোট ৬৯৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ভোটার স্যংখ্যা ছিল ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ২৮ জন। এবার ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন : ঢাকা উত্তরে ১৬ জন মেয়র প্রার্থীসহ মোট ৩৮৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ সিটিতে সাধারণ ৩৬ ওয়ার্ডে ২৮৩ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত ১২টি ওয়ার্ডে ৯০ জন নারী কাউন্সিলর লড়াই করছেন। মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হক, বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়াল, জাতীয় পার্টি সমর্থিত বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল ছাড়াও আবদুল্লাহ আল ক্বাফী, কাজী মো. শহীদুল্লাহ, চৌধুরী ইরাদ আহম্মদ সিদ্দিকী, নাদের চৌধুরী, মাহী বি. চৌধুরী, মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, মো. আনিসুজ্জামান খোকন, মো. জামান ভূঞা, মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকী, মো. সামছুল আলম চৌধুরী, শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ ও শেখ শহিদুজ্জামান। এ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৪ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ১১ লাখ ২০ হাজার ৬৭৩ জন ও পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ২৪ হাজার ৭০১ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১ হাজার ৯৩টি, ভোটকক্ষের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৯২টি। ঢাকা উত্তরে ১৮ হাজার ৭৬৯ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা কাজ করবেন। এদের মধ্যে ১০৯৩ জন প্রিসাইডিং, ৫ হাজার ৮৯২ জন সহকারী প্রিসাইডিং ও ১১ হাজার ৭৮৪ জন পোলিং অফিসার রয়েছেন।

ঢাকা উত্তরে সবমিলিয়ে ৩০ হাজার ৭৬৪ জন আইনশৃংখলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী এ সিটিতে সেনাবাহিনী এক ব্যাটলিয়ন সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্টে রিজার্ভ রাখা হয়েছে। এছাড়া ৩৫ প্লাটুন বিজিবি, ২ প্লাটুন কোস্টগার্ড, ৭২টি র‌্যাবের টিম ও ৯০টি পুলিশের মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স রয়েছে। এই সিটিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শাহ আলম এবং ১২ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচন : ঢাকা দক্ষিণে সাঈদ খোকন, মির্জা আব্বাস, হাজী মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন আহম্মেদ মিলনসহ ২০ জন মেয়র পদে লড়ছেন। সাধারণ ৫৭ ওয়ার্ডে ৩৯১ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত ১৯টি ওয়ার্ডে ৯৭ জন নারী কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্য মেয়র প্রার্থীরা হলেন- মো. গোলাম মাওলা রনি, আবু নাছের মুহাম্মদ মাসুদ হোসাইন, এএসএম আকরাম, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আয়ূব হোসেন, এসএম আসাদুজ্জামান রিপন, দিলিপ ভদ্র, বজলুর রশীদ ফিরোজ, মশিউর রহমান, মোহাম্মদ শফি উল্লাহ চৌধুরী, মো. আকতারুজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লাহ, মো. আবদুর রহমান, মো. আবদুল খালেক, মো. জাহিদুর রহমান, মো. বাহারানে সুলতান বাহার, মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, মো. শহীদুল ইসলাম ও শাহীন খান।

 এ সিটিতে মোট এই সিটিতে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৮৮৯টি ও ভোটকক্ষের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৪৬ টি। মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৬৭ জন ও পুরুষ ভোটার ১০ লাখ ৯ হাজার ২৮৬ জন। এই সিটিতে প্রিসাইডিং অফিসার ৮৮৯ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ৪ হাজার ৭৪৬ জন ও পোলিং অফিসার ৯ হাজার ৪৯২ জনসহ মোট ১৫ হাজার ১২৭ জন কর্মকর্তা ভোটগ্রহণে নিয়োজিত থাকবেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ২৬ হাজার ৪৯৬জন আইনশৃংখলা বাহিনী সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরিপত্র অনুযায়ী দক্ষিণ সিটিতে সেনাবাহিনী এক ব্যাটলিয়ন সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্টে রিজার্ভ রাখা হয়েছে। এছাড়া ৩৫ প্লাটুন বিজিবি, ২ প্লাটুন কোস্টগার্ড, ১১৪টি র‌্যাবের টিম ও ১৪২টি পুলিশের মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স রয়েছে। এই সিটিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ ও ১৯ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন : চট্টগ্রামে আ জ ম নাছির উদ্দীন, মোহাম্মদ মনজুর আলম ও মো. সোলায়মান আলম শেঠসহ মোট ১২ জন মেয়র পদে লড়ছেন। বাকি মেয়র প্রার্থীরা হলেন- আরিফ মইনুদ্দীন, এমএ মতিন, মোহা. শফিউল আলম, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. আলাউদ্দিন চৌধুরী, মো. ওয়ায়েজ হোসেন ভূঁইয়া, সাইফুদ্দিন আহমেদ রবি, সৈয়দ সাজ্জাদ জোহা ও হোসাইন মুহাম্মদ মজিবুল হক। চট্টগ্রাম সিটিতে ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৬২ জন ও ৪১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ২১৭ জন কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৯ জন। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৬ জন ও পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৭১৯টি ও ভোট কক্ষের সংখ্যা ৪ হাজার ৯০৬টি। চট্টগ্রামে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে ৭১৯ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ৪ হাজার ৯০৬ জন ও পোলিং অফিসার ৯ হাজার ৮১২ জনসহ মোট ১৫ হাজার ৪৩৭ জন কর্মকর্তা থাকবেন।
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবদুল বাতেন ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা পদে ১৪ জন দায়িত্ব পালন করছেন।
ভোট কেন্দ্রে মালামাল : সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করে এনেছেন। সোমবার ভোট কেন্দ্রে মালামাল পৌঁছেছে। সাধারণ কেন্দ্রে পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর ২২ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন সদস্য মোতায়েন থাকছে। এ নির্বাচনে বেশিরভাগ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাধিক কেন্দ্র রয়েছে সেখানে পুলিশের সদস্য সংখ্যা ৭ জনের স্থলে ৬ জন মোতায়েন থাকবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা : তিন সিটি কর্পোরেশনে ভোট গ্রহণ উপলক্ষে চার দিনের জন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রায় ৮০ হাজার সদস্য রোববার মাঠে নেমেছেন। বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী এলাকায় টহল দিচ্ছেন। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ভোট গ্রহণ উপলক্ষে পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে ২৬৮টি মোবাইল ফোর্স, ৬৬টি স্ট্রাইকিং ফোর্স, ২৬৮টি র‌্যাবের টিম, ১০০ প্লাটুন বিজিবি ও ৭ প্লাটুন কোস্টগার্ড সদস্য মাঠে রয়েছেন। তিন সিটিতে ২৪ প্লাটুন বিজিবি রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। বিজিবির প্রতি প্লাটুনের সঙ্গে ২ জন করে ২০০ জন, র‌্যাবের সঙ্গে ১৩৪ জন ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে ৭ জন ম্যাজিস্ট্রেটসহ মোট ৩৪১ জন।

নির্বাচনে সেনা সদস্যদের ক্যান্টনমেন্টে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতিরি অবনতি ঘটলেই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অনুরোধে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৯ম অধ্যায় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত ইনস্ট্রাকশন রিগার্ডিং এইড টু সিভিল পাওয়ারের সপ্তম ও দশম অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ও নিয়ম অনুযায়ী সেনাবাহিনী পরিচালিত হবে। মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বেসামরিক প্রশাসনকে আইনশৃংখলা রক্ষায় সহায়তা করবে। এ জন্য মিরপুর সেনানিবাসে ২, পোস্তগোলা সেনানিবাসে ২, ঢাকা সেনানিবাসে ৬, দমপাড়া সেনানিবাসে ২, হালিশহর সেনানিবাসে ২ ও চটগ্রাম সেনানিবাসে ২ জনসহ মোট ১৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অবস্থান করবেন। নির্বাচনী পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মনিটরিং সেল স্থাপন করা হবে।

 এ নির্বাচনে র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আর্মড পুলিশ সদস্যরা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবেন। মহানগর এলাকায় বিজিবি ও নির্বাচনী এলাকার নিকটবর্তী নদীপথ ও নদী বন্দরগুলোতে কোস্টগার্ড দায়িত্ব পালন করবে। তারা রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তার চাহিদা ছাড়া ভোট কেন্দ্রের অভ্যন্তরে কিংবা ভোট গণনাকক্ষে কোনো ধরনের দায়িত্ব নেবে না।

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যানবাহন চলাচলের বিধিনিষেধ, বৈধ অস্ত্র জমা দেয়া, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম, চেকপোস্ট স্থাপন, ভোটারদের যাতায়াতের পথ নির্বিঘ্ন রাখা, নির্বাচনী মালামালের নিরাপত্তা দেয়া, বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণ করতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে পরিপত্র জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।