বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে মৃত্যু হয় লি কুয়ানের। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তার বড় ছেলে লি সিয়েন লং সিঙ্গাপুরের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

সোমবার তার কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রী গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছেন, সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ মারা গেছেন।”

আধুনিক সিঙ্গাপুরের রূপকারের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানিয়েছেন।

এক শোক বার্তায় আবদুল হামিদ বলেছেন, লি কুয়ানকে একজন বীর, একজন নেতা হিসেবে স্মরণ করতে হবে।

আলাদা শোক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেছেন, লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে যে অবস্থায় এনেছেন, তা বাংলাদেশের জন্যও প্রেরণাদায়ী।

৭১৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে লি কুয়ান দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ৩১ বছর। তার পূর্বপুরুষ চীন থেকে এই দ্বীপে এসেছিলেন তিন পুরুষ আগে।

তার নেতৃত্বেই ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাথপিছু আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে ৫৫ লাখ মানুষের দেশ সিঙ্গাপুর। এ কারণে তাকে বলা হয় আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক।

২০০৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৮০তম জন্মবার্ষিকীতে লি কুয়ান ইউ ও তার স্ত্রী কো গেওক চো কেক কাটার আগে মোমবাতি নেভাচ্ছেন।

২০০৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৮০তম জন্মবার্ষিকীতে লি কুয়ান ইউ ও তার স্ত্রী কো গেওক চো কেক কাটার আগে মোমবাতি নেভাচ্ছেন।

এই সাফল্যের জন্য বিশ্বে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা আকড়ে থাকা এবং বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে হয়েছেন সমালোচিত।

১৯৫৪ সালে পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) গোড়াপত্তন করে ৪০ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন লি কুয়ান। সেই পিএপি এখনো সিঙ্গাপুর শাসন করছে, পার্লামেন্টে বিরোধী দলের সদস্য আছেন মাত্র ছয়জন।

তার মৃত্যুতে এক সপ্তাহের শোক ঘোষণা করেছে সিঙ্গাপুর। ২৯ মার্চ রাষ্ট্রীয়ভাবে তার শেষকৃত্যের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

লি কুয়ানের  প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে টেলিভিশনে এক বক্তৃতায় তার ছেলে ও সিঙ্গাপুরের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লং বলেন, “তিনি আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। একটি জাতিকে গড়ে তুলেছেন, যেখানে কিছুই ছিল না। সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসাবে গর্ব করার সুযোগ তিনি করে দিয়েছেন। তার মতো আর কাউকে আমরা পাব না।”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক শোকবার্তায় সিঙ্গাপুরের প্রয়াত এই নেতাকে অভিহিত করেছেন ‘ইতিহাসের একজন সত্যিকারের মহাজন’ হিসাবে, যার শাসন ও অর্থনীতি ভাবনার প্রশংসা বিশ্ব নেতৃবৃন্দ করে আসছে বহু বছর ধরে।

‘হ্যারি’ লি নামে পরিচিত লি কুয়ান জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। ১৯৫৯ সালে তিনি তৎকালীন স্বায়ত্তশাসিত সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

১৯৫৯ সালে পিপলস অ্যাকশন পার্টি (পিএপি) সিঙ্গাপুরের জাতীয় নির্বাচনের পর হাস্যোজ্জ্বল লি কুয়ান ইউ। ছবিটি একটি ভিডিওচিত্র থেকে নেয়া।

ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় সিঙ্গাপুর, যদিও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে মালয়েশিয়ার সঙ্গ ছেড়ে অল্প দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে যাত্রা শুরু করে সিঙ্গাপুর। দারিদ্র্য ও অপরাধে জর্জরিত এই বন্দর শহরটি পরের তিন দশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায় লি কুয়ানের নেতৃত্বে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান লি কুয়ান। তবে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন পার্লামেন্টের সদস্য।

লি কুয়ানের সময়ে সিঙ্গাপুরে বাজারমুখী অর্থনীতির প্রসার ঘটালেও সংবাদপত্র ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। এ কারণে আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়েও সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্বৈরশাসক।

১৯৮০ সালে এক সমাবেশে লি কুয়ান বলছিলেন, “সিঙ্গাপুর যেই শাসন করুক, তাকে আমার মতোই কঠোর হতে হবে, তা না হলে সেই চেষ্টা বাদ দিতে হবে।… সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলতে আমি আমার পুরো জীবন পার করে দিয়েছি, আর যতক্ষণ আমি দায়িত্বে আছি, কেউ এটাকে টলাতে পারবে না।”

তবে লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত করে সরকারের কাজে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, যার স্বীকৃতি প্রতি বছরই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।

আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের বাসভবনের বাইরে শোকাহত মানুষেরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় এবং নিজেদের অনুভূতি শোকবইতে লিপিবদ্ধ করেন।

লি কুয়ানের মৃত্যুর পর নুরহিদেয়াহ ওসমান নামে একজন ফেইসবুকে লিখেছেন, “ধন্যবাদ, আমাদের সিঙ্গাপুর দেওয়ার জন্য, অসাধারণ এক জাতির অংশ করার জন্য, এমন একটি দেশ দেওয়ার জন্য, যার জন্য আমি গর্বিত হতে পারি, এই দেশে আমি কোনো ভয় ছাড়াই গভীররাতে যে কোনো জায়গায় যেতে পারি।”

লি কুয়ান হাসপাতালে যাওয়ার পরও হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালের সামনে ফুল ও প্রার্থনা বাণী লেখা কার্ড রেখে যায় তাদের নেতার জন্য শুভকামনায়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, লি কুয়ানের ছেলে সিয়েন লংও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সেক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরে একটি যুগের অবসান ঘটবে।

তবে দেশটির শিল্পোদ্যক্তরা মনে করেন, লি পরিবার ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও এখন তা আর সিঙ্গাপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। ক্ষমতায় থাকাকালে লি যেসব প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে গেছেন সেগুলোই দেশের সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে বলে তারা মনে করেন।