প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশবাসীর মর্যাদা রক্ষায় তিনি যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছেন। ১৯৮১ সালের এই দিনে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের স্মৃতিচারণকালে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আবেগজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, আমি বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভয় পাইনি ও ঘাবরাইনি। কারণ আমি সবকিছু হারিয়েছি। এখন আর হারানোর কিছু নেই। আমি কারো কাছে নতি স্বীকার করিনি এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে কখনো নতি স্বীকার করবো না। দেশ ও জাতির মর্যাদা রক্ষায় আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছি। সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে পারবেন বলেও শেখ হাসিনা দৃঢ় আশাবাদী এবং অতীতের বাধাসমূহ পেরিয়ে আসতে সহায়তা করার জন্য জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের পিনপতন নিরবতার মধ্যে তিনি বলেন, দেশের জনগণ যদি আমার সঙ্গে না থাকতো তাহলে আমি এতদূর এগুতে পারতাম না অথবা এতো অর্জন আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।
প্রধানমন্ত্রী তার ৩৪তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে রবিবার সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা তাকে অভিনন্দন জানাতে আসলে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় মঞ্চে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এবং সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ বর্বরোচিতভাবে নিহত হওয়ার পর ৬ বছর প্রবাসে অবস্থান শেষে ১৯৮১ সালের এই দিনে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সময় শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা জার্মানীতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। এর আগে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহের নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া ও স্লোগান দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতাকালে পুরো সময়েই প্রধানমন্ত্রীকে কাঁদতে দেখা গেছে। এ সময় তার পাশে মঞ্চে বসে থাকা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর হাতের ওপর হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগকে চিরতরে নির্মূল করে দেয়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকে বর্বরোচিত হত্যার পর চার জাতীয় নেতাকে হত্যা এবং দলের অগণিত নেতা কর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেদিন প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ের মধ্যে তিনি দেশে ফেরেন। এ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে সমবেত হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি যখন দেশে ফিরে আসি তখন আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের সাহস ও অনুপ্রেরণা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নিয়ে আসিনি। তখন লাখো মানুষের ঢল বয়ে যায় এবং আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয়জনরা যাদের ভালোবাসা আমি প্রত্যাশা করি তারা সেদিন ছিলেন না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাতের সেই বর্বরোচিত ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী কাঁদতে থাকেন। তিনি তার পরিবারের ও দলের সে দুঃসময়ের সমর্থন এবং সহযোগিতা দেয়ার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশী, আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি, বুদ্ধিজীবী এবং দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
১৯৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসকদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত ও বিলুপ্ত করার অশুভ প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে ধ্বংস করে দিয়েছিলো। এ প্রসঙ্গে তিনি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার তার সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি ছিলো একটি কঠিন কাজ।
বিএনপি-জামায়াত জোটের সহিংস রাজনীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসী ২০১৩ ও ২০১৫ সালে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যাসহ তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ দেখেছে। দেশের জনগণ আর এ ধরনের নাশকতা দেখতে চায় না। এ প্রসঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে যাতে দেশ আবারো এ ধরনের অন্ধকারের দিকে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।