রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার আরো দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল বিকেল পর্যন্ত পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হলো।

বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন করে কারো নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হবে।

গতকাল ঢাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, গত সোমবার গভীর রাতে ও মঙ্গলবার সকালে পাহাড়ধসে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রঙামাটিতে ১১০, চট্টগ্রামে ২৩, বান্দরবানে ছয়, কক্সবাজারে দুই ও খাগড়াছড়িতে একজনের প্রাণহানির তথ্য তাদের হাতে পৌঁছেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ঢলে ভেসে গিয়ে, গাছ ও দেয়ালচাপায় এবং বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে আরো ১৪ জনের।

গতকাল রাঙামাটির লোকনাথ মন্দির এলাকা থেকে মুজিবর নামের এক শিশু এবং সার্কিট হাউস এলাকা থেকে মো. ইব্রাহীম নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পরে বিকেলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

ধসের পর রাঙামাটিতে ১৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে প্রায় দুই হাজার ১০০ মানুষ। তাদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও কেউ কেউ অভিযোগ করেছে, ঠিকমতো খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আশ্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আসলে আশ্রয়কেন্দ্রে যারা এসেছে, তারা সব সময় থাকছে না। কখনো আসছে, কখনো চলে যাচ্ছে। ফলে কোন বেলায় কতজন খাচ্ছে বা খাবে, তা নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। কিন্তু খাবার সংকটের প্রশ্নই আসে না।

শুক্র ও শনিবার রাঙামাটির গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সরকারি অফিসের ছুটি বাতিল করা হয়। ফলে গতকাল ছুটির দিনেও অফিস করেছেন বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদসহ পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গতকাল রাঙামাটিতে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে যান। বিকেলে তাঁরা রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করেন।

এ সময় পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এই সময় দেশে না থাকলেও তিনি সার্বক্ষণিক আমাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন, একজন মানুষও যেন আশ্রয়হীন না থাকে এবং একবেলা খাবারের কষ্ট না হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কারণেই আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে চাই। ’

গতকাল সকাল থেকে রাঙামাটি-কাপ্তাইয়ের পুরনো নৌরুটে আবার লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। রাঙামাটির সঙ্গে প্রতিবেশী সব জেলার সড়কপথ বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায় হিসেবে চালু করা হয়েছে এই রুট। প্রথম দিন রাঙামাটি থেকে দুটি এবং কাপ্তাই থেকে দুটি লঞ্চ চালু করার কথা থাকলেও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে তিনটি লঞ্চ চালু করা হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের সমাধান মিলছে : রাঙামাটি শহরজুড়ে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবেলায় উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। শহরের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করার পর জেলা প্রশাসক দেশের বৃহত্তম জ্বালানি তেল পরিশোধন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানিয়ে বলেছেন, তারা তেল সরবরাহ করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। কেউ তেলের বাড়তি দাম নিলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সড়ক যোগাযোগ বহু দূর : সেনাবাহিনীর রাঙামাটি রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. গোলাম ফারুক জানিয়েছেন, রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়া পর্যন্ত সড়কটি মোটামুটি ক্লিয়ার করা হয়েছে। তবে দেপ্যছড়ি এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার রাস্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় ঠিক কবে নাগাদ এই সড়কটি সম্পূর্ণভাবে ভারী যানবাহন চলার উপযোগী করা যাবে নিশ্চয়তা দিতে পারেননি তিনি। তবে আশ্বাস দিয়েছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যেই মিলবে সংকটের সমাধান। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের দুটি ব্রিজের কাজ চলছে, সেই কাজ শেষ হলেই সড়কটি চালু করা যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আর রাঙামাটি-কাপ্তাই সড়কের অন্তত দুটি স্থানে বড় কাজ করলে এ সড়কটিও চালু করা যাবে।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন জানিয়েছেন, মানুষ যেন অন্তত হেঁটে বা ছোট যানবাহন নিয়ে পার হতে পারে, সেই চেষ্টাই করছি। সড়কগুলো সম্পূর্ণভাবে যানচলাচল উপযোগী করার জন্য কাজ চলছে।

মিটেছে বিদ্যুৎ-পানির সংকট : বৃহস্পতিবার রাত থেকে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিদ্যুতের বাতি  জ্বলতে দেখা যায়। গতকাল সকালের মধ্যেই শহরের সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এলাকাগুলো বাদে পুরো শহরেই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। রাঙামাটি বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ কান্তি মজুমদার বলেন, ‘আমাদের কর্মীদের দিন-রাতের পরিশ্রমে বিদ্যুৎ চালু করা সম্ভব হয়েছে। তবে যেসব এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ও লাইন সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বা পাহাড় চাপা পড়েছে, সেখানে কিছুটা সময় লাগবেই। ’

বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় পানির সংকটও কেটে গেছে। ব্যক্তিগত পানির পাম্পগুলোও সচল হয়েছে। সেই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগও পানি সরবরাহ শুরু করেছে। ইতিমধ্যে অর্ধেক এলাকায় কমবেশি পানি দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে।

উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতা : দুর্গতদের সহায়তায় নিজেদের ইফতার পার্টির জন্য বরাদ্দ করা সব টাকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একদিনের বেতনের টাকা জেলা প্রশাসকের ত্রাণ শাখায় জমা দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। গতকাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের হাতে এই টাকা তুলে দেন পার্বত্য সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ভাইস চেয়ারম্যান তরুণ কান্তি ঘোষও উপস্থিত ছিলেন।

খাগড়াছড়িতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নিচ্ছে প্রশাসন : পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছে খাগড়াছড়ি জেলার বহু পরিবার। এ অবস্থায় গতকাল সকাল থেকে জেলা সদরের শালবনসহ কয়েকটি এলাকায় মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়। অনেকটা চাপ প্রয়োগ করে সরিয়ে আনা হয় ২২টির মতো পরিবারের ৪৫ জনকে। তাদের শালবন এলাকায় অবস্থিত একটি ডরমিটরিতে আশ্রয় দেওয়া হয়।

খাগড়াছড়ি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সহযোগিতায় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের সরিয়ে নেন। এ সময় জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল ইসলাম, পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এলিশ শারমিনসহ তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন।