মাত্র এক দিন পর ৭ মে (শুক্রবার) ‍সাধারণ নির্বাচন যুক্তরাজ্যে। বিশ্বের একটি শক্তিধর এই রাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশিদের আগ্রহ যেনো এবার একটু বেশিই। নিঃসন্দেহে তার ‍কারণ একটাই, এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনী এই টিউলিপ। বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ রেহানার মেয়ে।

লেবার পার্টির হয়ে সংসদ সদস্য হতে এই লড়াইয়ে হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসনে প্রার্থী হয়েছেন টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক।

ব্রিটেনের এবারের নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ১২ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যাদের মধ্যে টিউলিপ ছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন রূপা হক ও রুশনারা আলী।

রুপা লড়ছেন ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে। কিংস্টন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক রূপা হকও লেবার পার্টির প্রার্থী। আগে থেকেই সুপরিচিত নাম ও নির্বাচিত লেবার পার্টির এমপি  রুশনারা আলী এবারও জয়ী হবেন বলে সবাই নিশ্চিত। আর সম্ভাবনার পথে এগিয়ে আছেন এই দলের অন্য দুই প্রার্থী টিউলিপ সিদ্দিক ও রুপা হক।

টিউলিপ জনপ্রিয়তায় এগিয়ে তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বলা হচ্ছে লন্ডনে যে ক’টি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে তার শীর্ষে রয়েছে টিউলিপের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন।

২৩ বছর ধরে লেবার পার্টির দখলে রয়েছে হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন। কিন্তু এবার জটিল এক সমীকরণে রয়েছে এই আসন। ২০১০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার দলীয় প্রার্থী গ্লেন্ডা জ্যাকসন অনেকটা হারতে হারতেই মাত্র ৪২ ভোটে জিতে যান হ্যামস্টেড ও কিলবার্নের এ আসন। এ কারণেই ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি এবার এই আসনটিকে ‘টার্গেট সিট’ বানিয়েছে।

তবে হিসাব নিকেশে টিউলিপেরই পাল্লা ভারী বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। আশার খবর হচ্ছে, সবশেষ প্রাক নির্বাচনী জরিপ টিউলিপকে ৪৮ শতাংশ ভোট দিয়ে নির্বাচন জয়ের পথে এগিয়ে রেখেছে। জরিপে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী টোরি সায়মন মার্কাস ৩২ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। আর লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী মাজিদ নেওয়াজ পেয়েছেন ১০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন।

এই এগিয়ে থাকাকেই বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ ২০১০ সালের নির্বাচনে এই আসনের ভোট ভাগাভাগি হয় কড়ায় গণ্ডায়। সেবার এই আসনে প্রধান তিনটি দলের মধ্যে লেবার পার্টি ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, কনজারভেটিভ পার্টি ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৩১ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পায়।

তবে জরিপে যতই এগিয়ে থাকুন নির্বাচনে জয়ী হওয়াকে এখনো চ্যালেঞ্জিং হিসেবেই দেখছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি মনে করেন কিশোর বয়স থেকেই এই এলাকায় বড় হয়েছেন, স্কুলে পড়েছেন। এখানকার প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি অগ্রগতি তার জানা। মানুষের চাওয়া পাওয়ার হিসাব-নিকাশও রয়েছে তার কাছে। এর আগেই কাউন্সিলর হিসেবে জনগণকে সেবা যেমন দিতে পেরেছেন, ভালোবাসাও পেয়েছেন। আর তাতেই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন তিনি। ক্যামডেন এলাকায় এর আগে নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি যোগ দিয়েছিলেন লেবার পার্টিতে।

পুরো এলাকা সম্পর্কে তার জ্ঞান ও ধারনা, জনগণের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়েই চ্যালেঞ্জ জয় করতে চান টিউলিপ। প্রত্যাশা অনুযায়ী সবার সাড়া পাচ্ছেন, আর তাতেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন তিনি।

হ্যামস্টেড ও কিলবার্নের জনগণের মনের ভাষা শুনতে ও বুঝতে পারেন বলেই মনে করেন একজন দৃঢ়চেতা টিউলিপ সিদ্দিক।

এদিকে জরিপে এগিয়ে থাকার দিকটিতো রয়েছেই। লর্ড আসক্রফটের ওই জরিপ প্রতিবেদন সবচেয়ে বড় যে আশার বাণী দিচ্ছে তা হচ্ছে গত নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ভোট থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবার লেবার পার্টির প্রার্থী টিউলিপের দিকে ঝুঁকছে।

টিউলিপ নিজেও জানেন হ্যামস্টেড ও কিলবার্ন আসনটি ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের অন্যতম প্রধান টার্গেট। এর পরও ৭ মে’র নির্বাচনে আসনটি লেবার পার্টির হাতে তুলে দিতে কঠোর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মঙ্গলবার দিনটিও তার কাটছে সার্বক্ষণিক প্রচারণায়।
নির্বাচিত হলে রুশনারা আলীর দ্বিতীয় ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে হাউজ অব পার্লামেন্টে প্রবেশ করবেন টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক।

তবে কেবল দ্বিতীয় নয়, হতে পারে তৃতীয় ব্রিটিশ বাংলাদেশি সংসদ সদস্যও পেতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। সে আশা জাগিয়ে তুলেছেন ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটনে লেবার পার্টির অপর প্রার্থী রূপা হক।

বিশ্লেষকরা একটা ভিন্ন দিকও এক্ষেত্রে সামনে আনছেন। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি বাজেট কমানোয় এই এলাকার চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র (জিপি সার্জারি) বন্ধ হয়ে যায়। সে কারণে জনমনে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে সেটা রুপা হকের পক্ষ খুব কাজ দিয়েছে বলেই মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। আরও বড় কথা এটি লেবার পার্টির বড় টার্গেট আসন। কিংসটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বাংলাদেশি শিক্ষকের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা  সে কারণে কম নয়। আর রুশনারা আলীর আসনে তার বিজয় সুনিশ্চিত ধরে বলেই নিয়েছেন সবাই।

সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, ব্রিটেনের নির্বাচনী ইতিহাসে কোনো অভিবাসী প্রার্থী নিয়ে এবারের মতো এত মাতামাতি হয়নি। টার্গেট ‍আসনে ব্রিটিশ বাংলাদেশি এক প্রার্থীকে বসানো, আর প্রতিপক্ষের টার্গেট আসনেও অপর এক ব্রিটিশ বাংলাদেশি প্রার্থী দেওয়া তাদের ওপর দলের আস্থারই প্রকাশ। আর রুশনারা আলীর জয়ের বিষয়ে দল এতটাই নিশ্চিত যে তাকে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি।

প্রভাবশালী সব অনলাইন, প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে আসছে টিউলিপ সিদ্দিকী ও ডা. রুপা হককে নিয়ে খবর। গত রোববার মেয়র জনসন যখন ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে টোরি দলের প্রার্থী এনজি ব্রের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, সে সময় রুপা হক প্রশ্ন করতে এগিয়ে এলে তাকে নাজেহাল হতে হয়। সে ঘটনায় রুপার পক্ষ নিয়ে ফলাও করে খবর প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমগুলো।

মূল লড়াইযে লেবার পার্টির এড মিলিব্যান্ড আর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভের ডেভিড ক্যামেরনের মধ্যে এবারের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ঝুলন্ত পার্লামেন্টের দিকেই যাচ্ছে ব্রিটেন সে কথাও বলা হচ্ছে। সে সব কিছু নিয়ে   নানা আলোচনা-সমালোচনা এবং নীতি ও বক্তব্য নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে অনেকেরই চোখ টিউলিপ সিদ্দিকী আর রুপা হকের দিকে। রাজনীতিকদের পাশাপাশি চলচ্চিত্র তারকা, প্রখ্যাত লেখক, শিল্পী কলা-কুশলীদেরও দেখা গেছে তাদের পাশে দাঁড়াতে। ক্যাম্পেইনে অংশ নিতে। ব্রডকাস্টার ম্যালভিন ব্রাগ, অভিনেতা রিচার্ড উইলসন, ডেভিড ব্যাডিয়েল, গ্রেগ ওয়াইস এবং এমা থম্পসন, লেখক বনি গ্রির, ক্যাথি লেট, থিয়েটার পরিচালক জনাথান মিলার, নাট্যকার ডেভিড হ্যার, কমেডিয়ান এডি ইজ্জার্ড ছাড়াও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রবার্ট ওয়েব সরাসরি ক্যাম্পেইনে যোগ দিয়েছেন টিউলিপের।

ভোটারদের খুশি করতে শেষ মুহুর্তের ক্যাম্পেইনে ছুটে বেড়াচ্ছেন টিউলিপ ও রুপাও। ঘরে বসে নেই বঙ্গবন্ধুকন্যা ও টিউলিপের মা শেখ রেহানা। মেয়ের হয়ে লেবার পার্টির জন্য ক্যাম্পেইন করছেন তিনি।

আর কমিউনিটিগুলোতে বাংলাদেশিদের ভোট যাতে একটিও না হারাতে হয় সে লক্ষ্যে টিউলিপের পক্ষে প্রচারে নেমেছেন কমিউনিটির বাংলাদেশি নেত‍ারা।

এবারের নির্বাচনে অপর বাংলাদেশি ব্রিটিশ প্রার্থীরা হচ্ছেন- বেকেনহাম আসনে লেবার পার্টির ব্যারিস্টার মেরিনা আহমেদ, ওয়েলউইন অ্যান্ড হাটফিল্ড আসন থেকে লেবার পার্টির ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া, নর্থহ্যামটন সাউথ আসন থেকে লিবারেল ডেমোক্রেট দলের প্রিন্স সাদিক চৌধুরী, সারের রায়গেইট ও বানস্টেড আসনে লেবার পার্টির আলী আখলাকুল, লুটন সাউথ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটের আশুক আহমেদ, নর্থ ইস্ট হ্যাম্পশায়ার আসন থেকে লেবার পার্টির এমরান হোসাইন, স্কটল্যান্ডের এভারডিনশায়ারের বেনফ অ্যান্ড বুখান আসন থেকে লেবার পার্টির সুমন হক এবং ওয়েলসের আরফন আসন থেকে লিবারেল ডেমোক্রেট দলের মোহাম্মদ সুলতান। তাদের পক্ষেও বাংলাদেশি কমিউনিটি প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।