মোদীকে ভূয়সী প্রশংসায় ভাসালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

0
85

আজ যে বন্ধু, কাল সে-ই হয়ে যায় শত্রু। আবার আজ যে শত্রু কাল সে-ই ঘনিষ্ঠ বন্ধু বনে যায় জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছকটা তাই পাল্টে যায় সময়ের মানচিত্রে। যেমন পাল্টে গেলো যুক্তরাষ্ট্র। বদলে গেলো মার্কিন মুলুকের সর্বোচ্চ কর্তা বারাক ওবামার বক্তব্য।

যে নরেন্দ্র মোদিকে ক’বছর আগে ভিসাই দেওয়া হলো না- এখন তারই স্তুতি গাইতে শুরু করলেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) আমেরিকার প্রভাবশালী সাময়িকী ‘টাইম’-এ প্রকাশিত এক লেখায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভূয়সী প্রশংসায় ভাসালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

মোদিকে ভারতের ‘প্রধান সংস্কারক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বললেন, ‘তার গল্প ভারতের উত্থানের গতিশীলতা ও সম্ভাবনারই প্রতিফলন।’ সনাতন ভারতে ডিজিটাল স্বপ্নের ফেরিয়ালাও মোদিকে বানিয়ে দিলেন ওবামা।

স্মৃতির পট ঘেঁটে আরও বললেন, ‘মোদি যখন ওয়াশিংটনে আসেন, তখন তিনি ও আমি ড. মার্টিন লুথার কিংয়ের স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করি। এসময় আমরা লুথার কিং ও গান্ধীর (মহাত্মা গান্ধী) শিক্ষা নিয়ে মতবিনিময় করি এবং আমাদের দেশের মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের শক্তিকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি সে বিষয়ে কথা বলি। এসময় মোদি জানান, একশ’ কোটিরও বেশি ভারতীয় যেভাবে একসঙ্গে থাকছে এবং উন্নতি করছে সেটা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট মোদিকে নিয়ে এভাবে অবারিত প্রশংসার ভেলায় ভাসালেও বছর দশেক আগের পরিস্থিতি কী ছিলো- তা এবার অতীতের আয়নায় দেখে নেওয়া যাক।

২০০২ সালে ভারতের গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় রাজ্যটির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদিকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রে মোদির বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করা হয়। কেবল সেখানেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায়নি। ২০০৫ সালের মার্চে মার্কিন কর্তারা মোদিকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য ভিসা দিতেও অস্বীকার করেন। এমনকি বিশ্বব্যাপী মোদিকে ‘গুজরাটের কসাই’ হিসেবে পরিচিত করানোর প্রচারণায়ও নামে মার্কিন সংবাদমাধ্যম।

২০০২ থেকে ২০০৫ হয়ে ২০১৪ সালের মে মাস। এই দীর্ঘ সময় পর বিশ্ব রাজনীতির পট অনেকখানিই বদলে গেছে। পুরোপুরি বদলে গেছে মোদির ভাগ্যও। গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত সেই মোদি বনে গেছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী। বনে গেছেন এশিয়ার প্রধান নেতা এবং বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর সরকারপ্রধান। মোদির এই ‘পরিবর্তনে’ যুক্তরাষ্ট্র কেন বসে থাকবে! শেষতক তারাও পুরোপুরি ‘বদলে’ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

যে মোদিকে প্রায় একদশক যুক্তরাষ্ট্রের আশপাশেও ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি, সেই মোদিই এশিয়ার শ্রেষ্ঠতম পরাশক্তি দেশের প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে বসার পর তার ভিসার ওপর তড়িঘড়ি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ওয়াশিংটন। উপরন্তু তাকে মার্কিন মুলুকের মাটিতে পদধূলি দেওয়ার বিনীত আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন হোয়াইট হাউসের কর্তারা।

উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর মোদির আস্থা অর্জনে তার ‘পুরনো শত্রুরা’ তাকে প্রশংসায়ও ভাসাতে থাকেন। প্রশংসা করতে থাকেন মোদির নেতৃত্বের। এমনকি মোদিকে এশিয়ার সেরা নেতার খেতাবও দিতে থাকেন ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিরা।

সবশেষে সেই ‘গুজরাটের কসাই’য়ের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে এবং তাকে পর্যাপ্ত খুশি করতে ‘ভারতের প্রধান সংস্কারক’ (ইন্ডিয়া’স রিফরমার-ইন-চিফ’ খেতাব পর্যন্ত দিয়ে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।

‘টাইম’-এ বিশ্বের একশ’ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকায় মোদির ওপর সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ লিখে এ খেতাব দেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বিশ্লেষণটি বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) প্রকাশ করা হয়।

প্রশংসাধর্মী বিশ্লেষণটিতে ওবামা লিখেন-
“একজন বালক হিসেবে নরেন্দ্র মোদি তার বাবার চা দোকানে কাজ করে পরিবারকে সহযোগিতা করেছেন। আজ, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতা, এবং তার জীবনের গল্প- দরিদ্র বালক থেকে প্রধানমন্ত্রী- ভারতের উত্থানের গতিশীলতা ও সম্ভাবনারই প্রতিফলন।

অনুসরণীয় মোদি চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী ও শিশু শিক্ষার উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই তার দেশের সম্ভাবনাময় অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। ভারতের মতো ‘সেকেলে যোগব্যায়ামভক্ত’ দেশের মানুষকে টুইটারের মতো আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভ্যস্ত করে তুলেছেন এবং ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।”

ওবামার এই প্রশংসাবাণী মোদিকে ‘খুশি’ করার জন্য তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কিন্তু এক দশকেরও বেশি আগে যে মোদি হোয়াইট হাউস কর্তাদের ‘চক্ষশূল’ ছিলেন, তাকেই ‘খুশি’ করার জন্য এখন কেন এই খোলস বদলানোর তোড়জোড়?

বিশ্ব অর্থনৈতিক রাজনীতির ওপর যাদের ন্যূনতমও ধারণা আছে, তারাও বিনা বাক্যব্যয়ে বলে দিতে পারবেন, ভারত সবদিক থেকেই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বাণিজ্যিক ময়দান। এই ময়দানে বাণিজ্য করেই টিকে আছে মার্কিন মুলুকসহ তার পশ্চিমা মিত্র দেশের বণিকরা। খানিক ‘অবহেলায়’ সেই ময়দান যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে বিশ্বব্যাপী মোড়লগিরি করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থায়ন করবে কে? এই প্রশ্ন তৈরির প্রেক্ষাপটই যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য এই খোলস ‘বদল’ ওয়াশিংটনের।

তাছাড়া, বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি চীনের প্রভাবে এশিয়া যেন যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য এই মহাদেশেরই দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি ভারতকে ব্যবহার করতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিকে ‘সন্তুষ্ট’ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে হোয়াইট হাউস।

পাশাপাশি ভারত বিশ্ব-রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে পারে খুব তাড়াতাড়ি। নিরাপত্তা পরিষদে ফ্রান্স-ব্রিটেন ‍মার্কিন মোড়লদের প্রস্তাব-সিদ্ধান্তে অন্ধ সমর্থন জানিয়ে এলেও চীন বা রাশিয়া প্রায়ই বিরোধিতা করে থাকে। ভারত যদি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ের বাইরে অবস্থান নেয়, তবে নিরাপত্তা পরিষদে কোণঠাসা হয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়ে যাবেন ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিরা। সেসব ভয়-শঙ্কা থেকেও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিকে পূজা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রশংসায় ভাসিয়ে মোদিকে বশে রাখার কৌশল গ্রহণের আরও একটি কারণ আছে বৈকি! ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়ি ঘোরাতে হলে ভারতই হতে পারে যুক্তরাষ্টের সবচেয়ে সুবিধাজনক ভূমি। এরপূর্ব দিকে কখনোই সুবিধা করতে পারেনি মার্কিনিরা। ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে তাই এ অঞ্চলে আরও ব্যাকফুটে চলে যেতে চায় না তারা।