বার বার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তীক্ষ্ণ নজরদারির কথা বলা হলেও থেমে থাকছে না ঘাতকদের টার্গেট। মুক্তমনা ব্লগার ও লেখক হিসেবে সর্বশেষ ঘাতকদের ধারালো চাপাতির বলি হলেন সিলেটের অনন্ত বিজয় দাশ। গত তিন মাসে তিন ব্লগারকে একই কায়দায় হত্যা করা হলো।

মঙ্গলবার সকালে সিলেটের সুবিদবাজারে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অনন্তকে। আর হত্যার পর যথারীতি দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় আনসারুল্লাহ বাংলা ৮ নামের একটি সংগঠন।

এর আগে গত ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর ও ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ রায়কে টিএসসি এলাকায় একই কায়দায় হত্যা করা হয়। তবে ব্লগার ওয়াশিকুরকে হত্যা করে পালানোর সময় জনগণের ধাওয়ায় গ্রেফতার হয় দুই ঘাতক। পরবর্তীতে তাদের দেয়া তথ্যে আটক হয় আরো একজনকে। আর অভিজিৎ হত্যায় এখনো কেউ আটক হয়নি। অনন্ত বিজয় দাশকেও হত্যা করে পালিয়েছে ঘাতকরা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডও আনসারুল্লার স্লিপার সেলের কাজ। আমরা এই স্লিপার সেলের সদস্যদের গ্রেফতারে কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদী গ্রুপগুলোর ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারির জন্য পৃথক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি উত্থাপনের পর বর্তমানে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

ডিএমপির এই যুগ্ম কমিশনার আরও জানান, ব্লগার অভিজিৎ হত্যায় তদন্তে সহায়তার জন্য এফবিআইয়ের একটি টিম ঢাকা আসে। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ আদালতের অনুমতি নিয়ে কিছু আলামত নিয়ে যায়। এছাড়াও প্রযুক্তিগত সহায়তাও চাওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত আলামতের ফলাফল তাদের নিকট থেকে পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের মতন তদন্ত করে যাচ্ছি। কিছু নাম ঠিকানা পাওয়া গেছে যারা সেই দিন সরাসরি উপস্থিত থেকে হত্যায় অংশ নিয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

ওয়াশিকুর হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া দু’জনকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও একজনকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে একজন দায় স্বীকার করে আদালতে কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। বাকিরা কিভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দিয়েছে।

আমরা সেই মোতাবেক কাজ করে যাচ্ছি। ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, উগ্রবাদীদের নজরদারির জন্য আসলে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। যারা সার্বক্ষণিকভাবে তাদের উপর নজরদারি করবে।

তিনি বলেন, সংগঠনটি এখন কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল কায়েদা ও  আইএস স্টাইলে অপারেশন করছে। যার কারণে পুলিশের পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, আনসারুল্লাহ বাংলাটিম এখন ইন্টারনেটে প্রচারণা চালাচ্ছে। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও তারা প্রচারণা চালু করেছে।

অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা এখানে যোগ দিচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন যেহেতু ঝিমিয়ে রয়েছে সেহেতু ওই সকল দলের কেউ কেউ এখানে যোগ দিতেও পারে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আনসারুল্লাহ কৌশলী ভূমিকা নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। সুক্ষ্ণ পরিকল্পনায় হত্যার আগে নির্দিষ্ট মাদ্রাসার ছাত্র ও সদস্যদের ব্রেন ওয়াশ করিয়ে মাঠে নামিয়ে দিচ্ছে তারা। যেমনটি ওয়াশিকুরের বেলায় ঘটেছে।এই সদস্যদের কেউ কাউকে চেনে না।এমনকি তাদের নামও পরিবর্তন করা হয়। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধোঁকা দেয়ার জন্যই তারা এই কাজ করছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তার দাবি আমরা এই সংগঠনের সদস্যদের গ্রেফতারে কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে এদের দলনেতা রানা দেশের বাইরে রয়েছে। তবে দেশে যারা তার অনুসারী তাদের গ্রেফতারের কাজ চলছে।

এদিকে এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার মন্তব্য করেন এভাবে, আর কত লাশের ভার বইতে হবে বাংলাদেশকে? ড. অভিজিৎ রায়ের খুনিদের এখনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এর কিছুদিন পর ওয়াশিকুরকে হত্যা করা হলো। তার এক মাসের মধ্যে আবারো নতুন লাশ! বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের?

একের পর এক খুন করার পরেও এদের বিষদাঁত ভাঙ্গা হয়নি বলেই উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীরা আস্কারা পেয়ে আসছে বলে অভিযোগ করেন ইমরান এইচ সরকার।

তিনি বলেন, সকল মত-পথের মানুষকে নিরাপত্তা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ এই ন্যূনতম সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র। যার ফলাফল  ডেকে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ক্ষতি।

বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম-বোয়াফ এর সভাপতি কবির চৌধুরী তন্ময় বলেন, ব্লগার রাজীব হত্যার মধ্য দিয়ে ব্লগারদের হত্যার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা দিন দিন ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতর হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নিয়ে যারাই মিডিয়া কিংবা সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখালেখি করে নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানভিত্তিক জীবনচর্চার সহায়তা করে থাকে, তাদের লিস্ট তৈরি করে একের পর এক হত্যা করে চলেছে ধর্মান্ধ মৌলবাদী অপশক্তি ও পর্দার আড়ালে থাকা রাজনৈতিক অপতৎপরতাকারী ব্যক্তি-মহল।

এর আগে একই কায়দায় হত্যা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ ও ব্লগার রাজীব হায়দারকেও। ড. হুমায়ুন আজাদকে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একইভাবে আঘাত করা হয়েছিল। ওই বছরের ১১ আগস্ট জার্মানিতে মারা যান তিনি। একইভাবে ব্লগার রাজীবকে ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে হত্যা করা হয়েছিল। এর আগে গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় চ্যানেল আইয়ের ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ২০০৪ সালে হুমায়ূন আজাদ, ২০১৩ সালে রাজধানীর গোপীবাগে সিক্স মার্ডার, মিরপুরে ব্লগার রাজীব হায়দার ও উত্তরায় দলছুট জেএমবির কর্মকাণ্ড থেকে ফিরে আসা রাশিদুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শফিউল আলম, বুয়েট ছাত্র দীপ।

টার্গেট করা মুক্তমনাদের একের পর এক হত্যার মধ্যে দিয়ে উগ্রবাদীরা তাদের মিশন সফল করছে। পক্ষান্তরে খুনগুলোর কোন কূল কিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।