সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার সকল অন্ধকার ঘুঁচিয়ে আলোর প্রত্যাশা নিয়ে বের হচ্ছে রাজধানীবাসীর পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা-১৪২২।এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ‘অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে’। যেটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কবিতার লাইন।উগ্র সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার যেন চেপে বসেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও আজ হরণ করার চেষ্টা করছে ধর্মান্ধরা। তাদের বর্বর হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক মুক্তমনা মানুষ। সেই বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে এবারের শোভাযাত্রায়। এক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে মৌলবাদীদের হামলায় ব্লগার অভিজিৎ রায় ও ওয়াশিকুর রহমানের নিহত হওয়ার ঘটনাটি।

মঙ্গলবার (১ বৈশাখ) সকাল ৯টায় শোভাযাত্রাটি বের হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে। এরপর রূপসী বাংলা হোটেল ঘুরে টিএসসি হয়ে আবার একই স্থানে এসে শেষ হবে।

এরপর অনুষদের পশ্চিম পাশে সারা দিন ধরে চলবে পুতুলনাচ ও চড়ক। পরদিন সন্ধ্যায় বকুলতলায় শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা রক্তাক্ত প্রান্তর।

শোভাযাত্রায় আরও যা থাকছে: 
প্রতীকী মূল কাঠামোসহ মোট দশটি কাঠামো থাকছে এবারের শোভাযাত্রায়। এর মধ্যে রয়েছে একটি করে হাতি, ঘোড়া, বাঘ, মাছ, টেপা পুতুল ও ছাগল এবং তিনটি পাখি। পাখি তিনটির মধ্যে একটি কাকাতুয়া এবং দুটি পায়রা। এর প্রতিটি কাঠামোই ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করছে। ভাস্কর্য বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মাহমুদা খন্দকার স্মৃতি বাংলানিউজকে বলেন, শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা এবং সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে থাকছে ছাগল। এছাড়া বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে থাকছে বাঘ, হাতি, ঘোড়া, মাছ এবং টেপা পুতুল।

মূল দশটি প্রতীক ছাড়াও শোভাযাত্রার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠা অসংখ্য মুখোশ। ঢোল, ডুগি, একতারা, বাঁশিসহ দেশি বাদ্যযন্ত্রগুলোতো থাকছেই।

চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি:
রাত পোহালেই বৈশাখ। যত আয়োজন সারতে হবে আজ রাতের মধ্যেই। তাই চারুকলা অনুষদে ঢুকতেই চোখে পড়ল শিক্ষার্থীদের রাজ্যের ব্যস্ততা। কারও সঙ্গে এক মিনিট কথা বলাতো দূরের কথা, নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সময়ও যেন তাদের হাতে নেই।

শোভাযাত্রার মূল কাটামোগুলো প্রস্তুত। তবে এখনো কয়েকটিতে রঙ লাগানো বাকী। চারুকলার শিক্ষার্থীরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে লেগে আছেন রাতের মধ্যেই এগুলোকে পুরোপুরি প্রস্তুত করার জন্য।

এছাড়া চারুকলার সীমানা প্রাচীরকে বিভিন্ন আলপনার দ্যোতনায় সাজানোর কাজও এগিয়ে চলছে সমান তালে। রঙ তুলি দিয়ে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের বিভিন্ন দিক  ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে সীমানা প্রাচীরে।

গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের স্নাতকোত্তর বিভাগের শিক্ষার্থী অপু রায় জানালেন মধ্যরাতের মধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাবে।

চারুকলার বাইরে বারোয়ারি মেলার প্রস্তুতি: 
এদিকে বৈশাখের একদিন আগেই খুচরো দোকানিরা লোকজ সংস্কৃতির বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসেছেন চারুকলার আশপাশসহ ঢাবি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায়।

তাদের দোকানে শোভা পাচ্ছে বেতের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র, মাটির পুতুল এবং বাঁশিসহ বিভিন্ন খেলনা। মেয়েদের সাঁজগোজের জিনিস নিয়েও বসেছেন কেউ কেউ।

দোকানিরা জানালেন, আজকে কেবল দখল নিয়েছেন। কিন্তু মূল বিক্রি হবে কাল (পয়লা বৈশাখে)।

ঢাবি ক্যাম্পাসে সাজসাজ রব:
বাঙালির সমস্ত উৎসবকে ধারণ করলেও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব চেয়ে বড় উৎসব হয় পহেলা বৈশাখেই। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

নববর্ষে প্রতিটি হলেই দেওয়া হবে বিশেষ ধরনের উন্নত মানের খাবার। এজন্য প্রতিটি হলের নিজস্ব টাকায় কেনা হয়েছে এক বা একাধিক গরু। হলের কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীরা মিলে রাতে সে গরু জবাই দিয়ে উৎসবের আবহে মাংস তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকবে। দুপুরের মধ্যেই প্যাকেটে করে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে দেওয়া হবে উন্নত মানের খাবার।

এদিকে বৈশাখকে বরণ করতে ক্যাম্পাসের প্রতিটি অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনসহ প্রতিটি হলেই চলছে ধোয়ামোছার কাজ। কর্মচারীদের যেন এতটুকু ফুসরত নেই।

ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠান:
নববর্ষ উপলক্ষে ঢাবির প্রায় প্রতিটি বিভাগই আলাদা আলাদাভাবে অনুষ্ঠান আয়োজন করে। তবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলা বিভাগ, সংগীত বিভাগ ও নাট্যকলা বিভাগ। অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থীরাও।

বাংলা বিভাগের বর্ষবরণ উৎসব অনুষ্ঠানটি হবে কলা ভবনের সামনে অপরাজেয় বাংলার পূর্ব পাশের চত্বরে, সংগীত বিভাগ তাদের অনুষ্ঠান আয়োজন করবে বটতলায়, নাট্যকলা বিভাগ নাট মণ্ডলে এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অনুষ্ঠান হবে তাদের অনুষদ চত্বরে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনও আয়োজন করবে পান্তা ইলিশ উৎসবের।