সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনায় আওয়ামী লীগে স্বস্তির পাশাপাশি অস্বস্তিও দেখা যাচ্ছে। বিএনপি মাঠে থাকলে সরকারি দলের প্রার্থীরা ঝুঁকিতে থাকবেন বলে মনে করে দলের একটি অংশ। অন্য অংশের মত, বিএনপিকে আন্দোলন থেকে নির্বাচনী মাঠে আনতে পারাটাও একটা রাজনৈতিক বিজয়।
গত বৃহস্পতিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে বলেই নির্বাচন দেওয়া হচ্ছে। এ মুহূর্তে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না, একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এ প্রশ্ন তুললে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন তো হারার জন্যও দিতে হয়।
বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগ কীভাবে দেখছে—এ বিষয়ে কথা হয় দলের পাঁচ-ছয়জন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে। ভালো-মন্দ নানা দিকই তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে।
আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিটি নির্বাচন বিএনপির আন্দোলন থেকে বের হয়ে আসার একটা পথ। তারা এই নির্বাচনের মাধ্যমে অকার্যকর কর্মসূচি ত্যাগ করে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পেতে পারে এবং দলটি নির্বাচনে এলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সব রকম সুযোগ দেওয়াও হবে। দলীয় কর্মসূচি পালনে কোনো রকম বাধা না দেওয়ার কথাও জানান তাঁরা।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল শনিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচনে গেলে বিএনপিকে সব রকম রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায়, অনেক দিন ধরেই পর্দার আড়ালে সরকারের সঙ্গে বিএনপির অনানুষ্ঠানিক একটা যোগাযোগ ছিল। এ ক্ষেত্রে বিদেশি কূটনীতিকেরা মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছেন। আন্দোলন থেকে বের হওয়ার পথ হিসেবে কূটনীতিকেরা সিটি নির্বাচনকে বেছে নেওয়ার জন্য বিএনপির শীর্ষ পর্যায়কে পরামর্শ দেন বলে জানা যায়।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন, বিএনপি নির্বাচনে এলে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিতে পারবে না। ফলে আন্দোলন থেকে তাদের সরানো যাবে। হরতাল-অবরোধ কার্যকর না থাকলেও নাশকতা ও সহিংসতায় জনমনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে দেশবাসী মুক্তি পাবে। হরতাল-অবরোধের কারণে দুই মাসেও এসএসসি পরীক্ষা শেষ করা যায়নি। এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে পরীক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পারবে।
তবে নির্বাচনে বিএনপি থাকলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। তবু তাঁরা বিএনপির নির্বাচনে আসাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে চান।
জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ বিএনপির নির্বাচনে আসাকে ‘শত ফুল ফুটুক’ বলে মন্তব্য করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে আনার জন্যই আমরা নির্বাচন দিয়েছি। তাদের একটা এক্সিট (আন্দোলন থেকে বের হওয়ার পথ) দেওয়া হলো। আপসহীন নেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করবেন না। এখন করবেন।’
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন, সংলাপ নিয়ে সরকারের ওপর যে দেশি-বিদেশি একটা চাপ ছিল, বিএনপি নির্বাচনে এলে তা আর থাকবে না। সরকারকে অবৈধ বলার নৈতিক অধিকারও হারিয়ে ফেলবে বিএনপি। এরপর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সমালোচনা করারও মুখ থাকবে না তাদের। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়াটকে তাঁরা অনেক বড় রাজনৈতিক অর্জন বলে মনে করেন।
সরকারি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মতে, সিটি নির্বাচনের পর বর্ষাকাল শুরু হয়ে যাবে। এরপর রমজান মাস এবং ঈদুল আজহাসহ নানা কারণে বিএনপি আর আন্দোলন করার সুযোগ পাবে না। এসব দিক বিবেচনায় নিয়েও বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে দলটি।khaleda hasina (2)
আবার এ বিষয়ে আওয়ামী লীগে ভিন্ন রকম আলোচনাও আছে। বিএনপি নির্বাচনে আসুক, তা দলের একটা অংশ চায়নি। এই অংশটির মতে, বিএনপির হরতাল-অবরোধ ব্যর্থ হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে সিটি নির্বাচন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
আওয়ামী লীগের এই অংশের কয়েকজন নেতা মনে করেন, বিএনপি নির্বাচনে এলে তারা অবাধে দলীয় কর্মসূচি পালন করবে। দলটি চাপমুক্ত হয়ে যাবে। তা ছাড়া নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করলে দলটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণা চালাবে যে সরকারের জনপ্রিয়তা নেই। সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তখন তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি জোরদার করবে। সরকারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হবে।
বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি মাছ খায় না, কেবল মাছের ঝোল খায়।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন করে নির্বাচন কমিশন। তবে সরকার শেখ হাসিনার। এখন তারা নির্বাচনে আসছে। তাহলে গত দুই মাস যে তাদের সন্ত্রাসে এতগুলো নিরীহ মানুষ মারা গেল, এখন কী বলবে তারা?
মতিয়া চৌধুরী বলেন, বিএনপি গত দুই মাস যা করল, তা সন্ত্রাসনির্ভর নৈরাজ্য ও সহিংসতা। এটাকে আন্দোলন বললে আন্দোলনকে অপমান করা হয়।