প্রার্থীরা ‘নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ’ করার দাবি জানান

0
111

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ও অপর চার কমিশনার, ইসি সচিব, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। তারা নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়া, বৈধ-অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা না করা, গণমাধ্যমে দুই প্রার্থীর সংবাদ প্রকাশে অগ্রাধিকার দেয়াসহ নানা অভিযোগ তুলে ‘নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ’ করার দাবি জানান। একইসঙ্গে নির্বাচনে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালানোর সুযোগ চেয়েছেন প্রার্থীরা। জবাবে সিইসি বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য যা যা করা দরকার, তার সবই করবে ইসি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে ইসি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব দাবি জানান প্রার্থীরা । ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে রোববার রাজধানীর কেআইবি অডিটোরিয়ামে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঢাকা উত্তর সিটির প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র, কাউন্সিলর ও নারী কাউন্সিলর প্রার্থীরা অংশ নেন। তিন সিটি নির্বাচন সামনে রেখে সব প্রার্থীর সঙ্গে ইসির ধারাবাহিক মতবিনিময় সভার অংশ হিসেবে রোববার এ সভা অনুষ্ঠিত হল। আজ একই স্থানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বসবেন সিইসি ও অন্য কমিশনাররা।

মতবিনিময় সভায় রোববার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক, বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল, জাতীয় পার্টি সমর্থিত বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল, বিকল্পধারা মাহী বি চৌধুরী, জাসদ সমর্থিত নাদের চৌধুরীসহ অন্য প্রার্থীরা অংশ নেন। আনিসুল হক ও তাবিথ আউয়াল একই সোফায় পাশাপাশি বসেন। সভায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করছে- এমন অভিযোগ উত্থাপন করেন কয়েকজন প্রার্থী। এছাড়া কয়েকজন নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। এ সময় সভায় ব্যাপক হট্টগোল হয়। সভা চলাবস্থায় অনেক প্রার্থী চলে যান। ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহ আলম তাদের নিবৃত করতে বারবার অনুরোধ জানান। একপর্যায়ে বেলা পৌনে ১টার দিকে সভা সংক্ষিপ্ত করে সিইসিকে বক্তব্য রাখার অনুরোধ জানান নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ। এতে প্রার্থীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। বেলা ২টা পর্যন্ত মতবিনিময় সভা চলার কথা থাকলেও সোয়া ১টায় তা শেষ করা হয়।

মতবিনিময় সভায় আনিসুল হক বলেন, আমি আচরণবিধি মেনে চলছি। ক্রিকেট দলকে সংবর্ধনা দেয়া অনুষ্ঠানে আমার অংশ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তা আমাকে ওই অনুষ্ঠানে অংশ না নেয়ার অনুরোধ করায় আমি যাইনি। বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা ২০ দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি বন্ধ এবং প্রেফতার নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্তি দিয়ে ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’ সৃষ্টির দাবি জানান। তিনি বলেন, আমাকে ২০ দলীয় জোট ও আদর্শ ঢাকা আন্দোলন কমিটি সমর্থন দিয়েছে। আমাকে সমর্থনকারী অনেকে কারাগারে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের জামিনের ব্যবস্থার জন্য উদ্যোগ নিতে সিইসিকে অনুরোধ জানান তিনি। তাবিথ আরও বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের কোনো পদক্ষেপ এখনও দেখছি না। জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থী বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল নির্বাচন কমিশনারদের উদ্দেশে বলেন, আমরা যা বলি, তা আপনারা শুনেন না। মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে সময় নষ্ট না করে মাঠে প্রচারণা চালালে লাভ হতো। তবে আপনারা যা বলেন, তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবেন। নির্বাচনের আগে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে নির্বাচন কমিশনকে পরামর্শ দেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সমর্থিত প্রার্থী নাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, আপনারা অপ্রয়োজনীয় অনেক কথা বলেন। অপ্রয়োজনীয় কথা কম বললে সমালোচনা কম হবে।

 মেয়র প্রার্থী মো. আনিসুজ্জামান খোকন বলেন, এটা নির্বাচনের নামে প্রহসন হচ্ছে। এর আগে ৫ জানুয়ারিতে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছিল। এবার নির্বাচন দেখে মনে হচ্ছে, এক বা দুইজন ব্যক্তি নির্বাচন করছেন। নির্বাচন কমিশন কেন গণমাধ্যমগুলোকে বলছে না সবাইকে সমান সুযোগ দিতে। বিএনএ সমর্থিত প্রার্থী শেখ শহীদুজ্জামানও প্রচারে ‘সুযোগ না দেয়ায়’ গণমাধ্যমের সমালোচনা করেন। মাহী বি চৌধুরী নির্বাচন যেন ‘বিত্তবানদের লড়াই’ না হয় সেজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি করে কে কত টাকা খরচ করছেন, তা তদারকির প্রস্তাব দিয়েছেন। গণমাধ্যমে সমান সুযোগ চেয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক প্রার্থীর প্রচার এবং নির্বাচনী ইশতেহার গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। এজন্য প্রচারিত সময়কে প্রত্যেকের জন্য সমান ভাগে ভাগ করে দিতে হবে। তার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি বলেন, নির্বাচনে পেশিশক্তি ও টাকার খেলা বন্ধ করতে কমিশনকে উদ্যোগ নিতে হবে। এরপর কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলররা বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে কেউ কেউ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি জানান।

সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশ্বাস সিইসির : ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। একইসঙ্গে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে যা যা করার, তাই করার আশ্বাস দেন তিনি। তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রতিটা ক্ষেত্র ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নিজেকে বিপদগ্রস্ত করবেন না। নির্বাচনে সেনা মোতায়েন বিষয়ে সিইসি বলেন, ১৯ এপ্রিল আইনশৃংখলা বৈঠকে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

 নির্বাচনে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, আপনারা দৃঢ় ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে ভোট সম্পন্ন করার জন্য আপনারা (প্রার্থীরা) সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন করবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, আসুন, শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে তুলি। সে দিনটি আসুক, যে দিন নির্বাচনের জন্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজন হবে না ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়োগের। আসুন, গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র পরমত সহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে ভোটারদের রায় খোলা মনে নেয়ার সংস্কৃতির চর্চা করি।

সিইসির সমাপনী বক্তব্য না শুনেই চলে যান হেভিওয়েট মেয়র প্রার্থীরা : মতবিনিময় সভায় প্রথমে সিইসিসহ অন্য কমিশনাররা প্রার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। এরপর মেয়র, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীদের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। প্রথমে মো. আনিসুজ্জামান খোকন এবং সর্বশেষে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হক বক্তব্য দেন। আনিসুল হকের আগে তাবিথ আউয়াল বক্তব্য রাখেন। মেয়র প্রার্থীদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরই আনিসুল হক, তাবিথ আউয়ালসহ কয়েকজন মেয়র প্রার্থী একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যান। তারা ফটোশেসন করে সিইসির সমাপনী বক্তব্য না শুনেই বেরিয়ে যান। এ সময় তাদের অনুসরণ করে সভাস্থল ত্যাগ করেন বেশিরভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী।