প্রযুক্তি আশির্বাদের সাথে আমাদের কী কী সর্বনাশ করছে

0
156

প্রযুক্তিকে আমরা সবাই আশির্বাদ হিসাবেই গ্রহণ করেছি, গ্রহণ করি এবং গ্রহণ করব সব সময়। কিন্তু সব কিছুর মতো প্রযুক্তিরও কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে। বিভিন্ন রোগের জন্য আমরা যখন ঔষধ সেবন করি তখন যেমন দেখা যায় সংশ্লিষ্ট রোগ ভালো হলেও ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারনে অন্য রোগ বাধিয়ে বসি। ঠিক তেমনি প্রযুক্তির বিভিন্ন সুযোগকে কাজে লাগাতে গিয়ে আমরা নিজেদের জন্য কিছু সর্বনাশ ডেকে আনি। যাহোক, চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক প্রযুক্তি আশির্বাদের সাথে আমাদের কী কী সর্বনাশ করছে।
সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্নতা
কিছু মানুষকে লক্ষ্য করা যায় তারা অন্যান্যদের মত অতটা সামাজিক না। যার কিছুটা ওই লোকের সাইকোলজিক্যাল কারন আর কতকগুলো তার নিজের সৃষ্টি। বিজ্ঞান – প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবী ছোট করে দিয়েছে। সেই আক্ষরিকভাবে আমরাও তাতে আটকে গিয়েছি। সামাজিকতার অভাব বা কারো সাথে মেলামেশার এমনকি কথা বলারও ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছি। এর থেকে ইন্টারনেটে, আইপ্যাড, ট্যাবলেটেই সময় পার করে দেই খুব সহজেই। যার ফলে মনের অজান্তেই আমরা নিজেদের সব কিছু থেকে আলাদা করে ফেলি।
স্বাস্থ্যের অবনতি কিংবা অতিরিক্ত স্থুলতা
আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কম্পিউটারে বা মোবাইলে বসে গেম খেলছি অথবা ইউটিউবে মজার মজার ভিডিও দেখে সময় পার করছি, ফেসবুকিং করছি। কোন ধরনের ব্যায়াম বা মাঠে খেলাধুলা করছি না। এর ফলে আমাদের দৈহিক পরিশ্রম না করায় স্থুলতা বেড়ে যাচ্ছে। কিংবা স্থাস্থের ব্যাপক অবনতি হচ্ছে।
বিষন্নতা এবং হতাশার সৃষ্টি
বর্তমান সময়ে খুব কমন একটা শব্দ হয়ে দাড়িয়েছে এটি। বিষন্নতার শব্দের সাথে সোশাল সাইট গুলোর কথা এখন অটোমেটিক চলে আসে। কারন ফেসবুক কিংবা টুইটারে দিনে অনেকবার দেখা যায়, অকারনে মন খারাপ স্ট্যাটাস কিংবা টুইট। যার ফলে মনোবিজ্ঞানীদের কাছেও বিষন্নতা নতুন এক নতুন গবেষনার অংশ হয়ে দাড়িয়েছে। তারা বিভিন্ন নতুন নতুন তথ্যও দিচ্ছেন বিষন্নতা সম্পর্কিত। তবে অন্যের টাইমলাইনের ছবি, লাইক, পোশাক, অবস্থার উন্নতিও আমাদের বিষন্নতা সৃষ্টির কারন। যার আত্মবিশ্বাসের অভাব, হতাশা, ইর্ষা ইত্যাদি আমাদের চেপে ধরে।
নিদ্রাহীনতা এবং অসময়ে ঘুম
অনলাইন এক্টিভিটি বা ফেসবুকে সময় পার করা সমচেয়ে সহজ। আপনি টেরই পাবেন না কখন সময় চলে যায়। সময় চলে যায় ঘুমেরও। পরের দিনে ক্লাস বা অফিস থাকলে আপনার পরিমিত ঘুমের সময়ও কমে যায়। যার ফল কর্মক্ষেত্রে ও শারীরিকভাবে নানা ধরনের সমস্যা দেখা যায়।
অনেক সময় এরকম হয় যে সারারাত না ঘুমিয়ে আপনি সকালে কিংবা কাজের সময়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। যেটা আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থার জন্যও একটা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।
পরিবেশ দূষন
ইলেক্ট্রনিক্স আর টেকনলজি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে। পুরোন বা নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি ফেলে দিচ্ছি। অথবা পুড়িয়ে ফেলছি যা পরিবেশ দুষনে সাহায্য করছে। পোড়ানোর মাধ্যমে বাতাসে নানা বিষাক্ত পদার্থ্য ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যন্ত্র আবর্জনার সুষ্ঠু ব্যাবস্থাপনা করা হচ্ছে না। আমাদের মাটিগুলো তাতে নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে গাছ গাছালিতে। আমরা নতুন নতুন গ্যাজেট কিনেই সব ভুলে যাই। যার ফলে পৃথিবীকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে যাই অজান্তেই।
সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা
খুব গুরুত্বপূর্ন একটা ইস্যু। আপনার গোপনীয় সব কিছুই ফালাফালা করে দেয়া হচ্ছে জানেন কি? কিভাবে? আপনার ফেসবুকে প্রতিটি লাইক, তথ্য, ছবি, স্ট্যাটাস, আপনি যা যা শেয়ার করেন সবই অন্যের কাছে খুব সহজেই চলে যাচ্ছে। আপনার তথ্য আপনি এভাবেই বিকিয়ে দিচ্ছেন। এখন তো এমন অবস্থা হয়ে দাড়িয়েছে আপনি দুই মিনিট আগে কোথায় ছিলেন তাও জানা যাচ্ছে। এভাবেই আপনার গোপনীয়তার ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ফিশিং, হ্যাকিং, ভাইরাস ইত্যাদির মাধ্যমে ইনফরমেশন চুরি করে নানাবিধ অপরাধ করা হচ্ছে।
মানুষ যেখানে যন্ত্র
ইউটিউবের নানারকম প্র্যাংক ভিডিও, ট্রলিং ছবি, ভিডিও ইত্যাদি আমাদের গভীর ভাবে চিন্তা করতে বাধা দিচ্ছে। আমরা নানা রকম কল্পনার আকাশে ভাসা শুরু করেছি। কিন্তু বাস্তবতা বা এর গুরত্ব আমরা ভুলেই যাই। যার ফলে আমাদের বাস্তবতা ফিকে হয়ে যাচ্ছে টেকনোলজির জালে।
সামাজিক বন্ধনে দুর্বলতা
সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো আসাতে অনেক সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা কমে গেছে। কেননা এখন সবাই ফেসবুক বা টুইটারের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনাকেই মুখ্য হিসেবে মেনে নিয়েছে। যা আদৌ বাস্তবিক কোন  সমাধান না। আমরা আজকাল ভুলতে বসেছি সামাজিকতা বলে কিছু আছে। যোগাযোগগুলোও ভার্চুয়াল হওয়ায় আমরা কাছের মানুষগুলোর ভার্চুয়াল সঙ্গ পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে শুরু করেছি।
এডাল্ট কন্টেন্টে আসক্তি
আপনি যদি এডাল্ট কন্টেন্ট বা যেটাকে (১৮+) বলে জানে সবাই তার প্রাপ্তিস্থানের কথা বলেন তাহলে ইন্টারনেট ছাড়া আর কোন ভাল উৎস থাকতে পারে না। এখন খুব সহজেই নানারকম নগ্নচলচিত্রের উপাদান পাওয়া যায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। যা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। প্রথম আয়ের দেশগুলোতে এডাল্ট সাইটের এর উপরে কড়াকড়ি কার্যকর আইন থাকলেও মধ্যম বা ৩য় বিশ্বের দেশগুলোতে এসব প্রায় উন্মুক্তই বলা চলে। এর ফলে সমাজে যৌন হয়রানি সহ নানা বিকৃত কার্যকলাপের চিত্র প্রায় দেখা যাচ্ছে। এছাড়া মেয়েদের ছবি নানাভাবে ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে  দেওয়া এখন একটা সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাড়িয়েছে।
ক্রমাগত মনযোগহীনতা
আমাদের আশে পাশের অনেক কিছুই আমরা মিস করে ফেলি। যখন সবাই আড্ডায় মত্ত আপনি ঘাড় গুজে হয়ত ফেসবুকে কাউকে মেসেজিং করছেন অথবা গেমস খেলছেন। অথচ সুন্দর সময় বা আড্ডাটা আপনার জীবন থেকে হারিয়ে গেল তা বুঝতেই পারলেন না।
মাথা ও গলায় ব্যাথা
অধিক সময় স্ক্রিন বা মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। একই ভাবে অনেক্ষন ধরে বসে থাকলে বা তাকিয়ে থাকলে মেরুদন্ডের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি
আমরা শুধু প্রযুক্তিতে নির্ভর করেই বেঁচে থাকি না। আমরা এটায় আসক্তও বটে। লক্ষ্য করবেন কিছু মানুষ এর ফোন হাতে না থাকলে খুব অস্বস্তিবোধ করে। অনেকটা মাদকাসক্তির মত। এছাড়া নিত্য নতুন গেজেটের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহও অন্যতম কারন।
সহানুভূতির অভাব
ভিডিও গেমস, টিভি, চলচিত্র, ইউটিউবের কারনে মানুষের মনে ধ্বংসাত্বক অনূভুতির জন্ম নিয়েছে। গোলা গোলি, মারামারি ও বিভিন্ন একশান চিত্রায়ন থেকে এসব মনোবৃত্তির সৃষ্টি হচ্ছে। যা সমাজের উপরে প্রভাব পড়ছে। অপরাধ প্রবণতা বাড়ার আরেকটি কারন এটা। এছাড়া সংস্কৃতি এসব বিষয়ের কারনে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।
বৈদ্যুতিক অপচয়
যত বেশী ইলেকট্রিক ডিভাইস ততই বিদ্যুৎ এর চাহিদা। যদিও আজকাল যন্ত্রগুলো এমন ভাবে তৈরি যাতে খুব কম বিদ্যুৎ ব্যাবহৃত হয়। তবুও যত্র তত্র ব্যবহারের মাত্রাও কম নয়। অনেকেই তাদের কম্পিউটার চালু রাখেন অযথায়। এখন কম বেশী সবারই একের অধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস আছে। তাদের সঠিক বৈদ্যুতিক ব্যাবহার নিশ্চিত করা হয় না।
শিশুর মানষিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা
মাত্রারিক্ত ভিডিও গেমস, টিভির অনুষ্ঠান, ট্যাব, ইত্যাদি শিশুদের সাভাবিক বিকাশে চরম বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে সামাজিকভাবে বেড়ে না উঠে একাকি বড় হচ্ছে একটা শিশু। যে সময় মাঠে খেলাধুলা করবার কথা সেটি কম্পিউটার এ ভিডিও গেমসে করে কাটিয়ে দিচ্ছে। অধিক প্রযুক্তির ব্যবহারে শিশুদের মস্তিষ্ক ব্যবহার করতেও অনুৎসাহিত করছে। আজকাল ক্লাস ৩ কিংবা ৪ এর ছেলে মেয়েরা সাধারন যোগ বিয়োগ গুন কিংবা ভাগ করতে ক্যালকুলেটরের সাহায্য নিচ্ছে!!!
স্নায়ুবিক সমস্যা
টেকনোলজির কারনে আমাদের মাঝে মানষিক ও আবেগজনিত নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। উচ্চামাত্রার ভায়োলেন্স বা অতিরিক্ত নগ্নচলচিত্র দেখা ইত্যাদি মানষিক বা স্নায়ুতে বিরুপ ছাপ ফেলে।
কান ও চোখে সমস্যার সৃষ্টি
কান এবং চোখ হলো প্রযুক্তির স্বাদ গ্রহনের গুরুত্বপূর্ন দুই উপাদান। তাও এদের ক্ষমতা নষ্ট হয় প্রযুক্তির অপব্যবহারে। মাত্রাতিরিক্ত হেডফোনে গান শোনা বা অনেক সময় মনিটরের উজ্জ্বল স্ক্রীনে তাকিয়ে থাকলে ধিরে ধিরে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবনশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। এর ফলে দেখা যায় খুব অল্প বয়সে চোখে চশমা চলে আসে । অথবা কানে শোনার যন্ত্র (হেয়ারিং এইড)।