নিরাপত্তারক্ষীকে জবাই করে ব্যাংকে ডাকাতির চেষ্টার সঙ্গে জড়িত পাঁচ অপরাধীকে শনাক্ত করে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। নিরাপত্তারক্ষীর কাছ থেকে লুট করে নেয়া মুঠোফোন থেকে একটি কলের সূত্র ধরে খুনিদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পেরেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার হওয়া চারজন হল, মাহবুব, সাগর, গিয়াস ও আরিফ। বাকলিয়া-বগারবিলসহ আশপাশের এলাকার মূর্তিমান আতংক গিয়াস যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং আওয়ামী লীগ দলীয় স্থানীয় এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ অনুসারী। আরিফ সাবেক এক মন্ত্রীর এপিএস’র দেহরক্ষী হিসেবে পুলিশের কাছে পরিচিত।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের মধ্যে মাহবুব ও সাগর সরাসরি খুনের সঙ্গে জড়িত। গিয়াস পুরো ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছিল। আরিফের বাসায় ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা হয়েছিল এবং ঘটনার পর খুনীদের নিজ বাসায় সে আশ্রয় দিয়েছিল।

খুনের সঙ্গে মাসুদ নামে আরও একজন জড়িত ছিল। এখন মাসুদকে গ্রেপ্তারের জন্য খুঁজছে পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনই গিয়াসের অনুসারী কর্মী বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র।

গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) গভীর রাতে নগরীর মুরাদপুর এলাকায় ইসলাম টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে ডাকাতির চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তারা ব্যাংকের নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষী মো.ইব্রাহিমকে (৩৪) খুন করে। প্রায় ৪৪ ঘণ্টা পর শুক্রবার (৮ মে) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হয়।

শনিবার (৯ মে) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল জলিল মন্ডল এ ঘটনার তদন্তভার নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে (ডিবি) অর্পণ করেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের সাতদিনের মধ্যে নগর গোয়েন্দা পুলিশ পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেছে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (এডিসি) এস এম তানভির আরাফাত  বলেন, ‘খুনিদের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকে ডাকাতি করা। সেটা করতে গিয়ে তারা নিরাপত্তারক্ষীকে খুন করেছে।’

তবে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত কোন বর্ণনা দিতে রাজি হননি এডিসি তানভির।

ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী খুনের তদন্ত টিমে আছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম ও আজিজ আহমেদ এবং উপরিদর্শক (এসআই) সন্তোষ কুমার চাকমা ও রাসেল মিয়া। এই টিমে মূল তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আছেন জাহিদুল ইসলাম।

খুনের পর দুই খুনি চলে যায় কিশোরগঞ্জে

পুলিশ সূত্রমতে, হত্যাকাণ্ডের পর মাহবুব ও মাসুদ যায় নগরীর বাকলিয়ায় মৌসুমী বিল্ডিং এলাকায় আরিফের বাসায়। আরিফের বাসায় গিয়াস, মাহবুব, মাসুদ, সাগর ও আরিফ মিলে ব্যাংকে ডাকাতির পরিকল্পনা হয়েছিল। সেই বৈঠকে আরিফের বাসাকে ডাকাতির পূর্বাপর আস্তানা হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা।

সূত্র জানায়, আরিফের বাসা থেকেই গিয়াস, মাহবুব, মাসুদ ও সাগর ডাকাতির জন্য মুরাদপুরে যায়। ঘটনার পর রাত ৩টার দিকে সেখান থেকে মাহবুব ও মাসুদ আবারও আরিফের বাসায় ফিরে আসে।

আরিফ পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, আরিফের বাসায় প্রথমে যায় মাহবুব। গিয়েই মাহবুব বিছানায় শুয়ে পড়ে। এরপর মাসুদকে ফোন দেয় মাহবুব। মাসুদ যাবার পর দু’জনে মিলে ইয়াবা সেবন করে। আরিফ মাসুদের প্যান্টে রক্ত দেখে চিৎকার করে উঠে, ‘দোস্ত, তোর প্যান্টে রক্ত কেন?’ মাসুদ বলে, ‘চুপ। আমরা খুন কইরা ফালাইছি।’ এরপর মাসুদ বগার বিল এলাকায় নিজের বাসায় গিয়ে রক্তমাখা প্যান্ট খুলে আবারও আরিফের বাসায় ফিরে আসে। মাহবুব ও মাসুদ আরিফের বাথরুমে গোসল সারে।

সূত্রমতে, গোসলের পর মাহবুব সাগরকে ফোন করে। সাগর প্রায় আধা ঘণ্টা পর আরিফের বাসায় আসে। সাগর আসার পর মাহবুব রিক্সা নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় মাহবুব কোথায় যাচ্ছে সেটা কাউকে জানায়নি। সাগর এসে গিয়াসকে ফোন করে বলে, ‘বস, আমি পালিয়ে যাব।’ গিয়াস বলে, ‘গেলে যা। কয়েকদিন সেইফ এ থাক। আমার কোন সমস্যা নেই।’

সাগর আরিফকে বলে, ‘আমাকে ট্রেনের টিকেট করে দে। আমি চলে যাব।’ মাসুদ আর সাগর রেলস্টেশনে গিয়ে ঢাকার কোন টিকেট না পেয়ে অলংকার মোড়ের বাসস্ট্যান্ডে চলে যায়। যাবার সময় বিআরটিসি মার্কেট থেকে কিশোরগঞ্জের বাসের একটি টিকেট কেনে।

জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ পুলিশকে জানায়, সাগরকে বাসে তুলে দিতে গিয়ে আরিফ দেখতে পায় সেখানে মাসুদও আছে। মাসুদ আরেকটি বাসে করে কুমিল্লা চলে যায়। সাগর চলে যাবার পর আরিফ বাসায় ফিরে আসে। ততক্ষণে ভোর হয়ে যায়। আরিফ মাসুদের কাছে জানতে পারে, মাহবুবও আরেকটি বাসে করে কিশোরগঞ্জে চলে গেছে।

ফোনকলের সূত্র ধরে খুনি কাছে পুলিশ

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকে ঢুকে নিরাপত্তারক্ষীকে খুনের পর তার সিমসহ মোবাইল সেটটি লুট করে নিয়ে যায় খুনিরা। মোবাইল সেটটি ছিল সাগরের কাছে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন ঘণ্টা পর সাগর ওই মোবাইল সেট থেকে নিরাপত্তারক্ষীর সিমটি খুলে ফেলে দিয়ে আরিফের সিম ঢোকায়। এরপর সেই মোবাইল সেট ও আরিফের সিম থেকে দলনেতা গিয়াসকে ফোন করে সাগর।

সূত্রমতে, ডিবি তদন্ত শুরুর পর সাগরের ফোনকলের তথ্য পায়। ওই ফোনকল যাচাই করতে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখতে পান, কল করা হয়েছে বাকলিয়া এলাকা থেকে। তবে বাকলিয়ায় গিয়ে খুনির সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। কারণ মোবাইল সেটটি সাগর খুলে বিক্রি করে দিয়েছিলো এক সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চালকের কাছে। তদন্তে নেমে ওই চালকের কাছ থেকে মোবাইল সেটটি উদ্ধার করে পুলিশ।

তবে আরিফের সিমটি সচল ছিল। সেই ফোন নম্বরের সূত্রে পুলিশ আরিফের অবস্থান নির্ণয় করে ফেলে নগরীর বাকলিয়ায়। এক পর্যায়ে গত মঙ্গলবার (১২ মে) পুলিশ আরিফকে নগরীর শাহ আমানত মার্কেট থেকে গ্রেপ্তার করে। আরিফের তথ্য অনুযায়ী একই সময়ে সেখান থেকে গিয়াসকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পুলিশ গিয়াসকে গ্রেপ্তার করবে সেটা গিয়াস নিজেও ভাবেনি। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত ডিবি’র কার্যালয়ে নিয়ে আসে। অবশ্য গিয়াসকে গ্রেপ্তারের জন্য নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার তার এক বন্ধুরও সহযোগিতা নেয় পুলিশ।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, গিয়াস অভিজাত স্টাইলে চলাফেরা করে। তার মধ্যে নেতাসুলভ ভাব আছে। নিজেকে ক্ষমতাধর মনে করলেও যুবলীগের কোন পদে নেই সে। তবে এলাকার লোকজন তাকে যুবলীগ নেতা হিসেবে চেনে । এজন্য গিয়াস কখনও ভাবেনি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করবে।

এদিকে সাগর কিশোরগঞ্জে গিয়ে একটির পর একটি সিম পাল্টাতে থাকে। কিন্তু মোবাইল সেট একই হওয়ায় পুলিশ সহজেই তার অবস্থান নির্ণয় করতে সক্ষম হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ সাগরের মাকে নজরদারির মধ্যে আনে। সাগর তার মাকে মঙ্গলবার বলে, ‘মা আমি অনেক বড় একটা কাজ কইরা ফালাইছি। আমি খুন কইরা ফালাইছি মা। পুলিশ আমারে পেলে মাইরা ফেলবে মা। তুমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে কিশোরগঞ্জে খালার বাসায় আসো।’

সাগর আর তার মায়ের কথোপকথন জেনে যায় পুলিশ। এর সূত্র ধরে কিশোরগঞ্জের খালার বাসার তথ্য পায় নগর গোয়েন্দা পুলিশ। অন্যদিকে মাহবুবের সঙ্গে ডিবি’র হেফাজতে থাকা আরিফ ও গিয়াসের কথোপকথনের সূত্র ধরে তার অবস্থানও নির্ণয় করে ফেলে পুলিশ।

এ সব তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার রাতে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থেকে সাগর এবং মাহবুবকে একই জেলার অষ্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের বৃহস্পতিবার রাতে নগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

তবে পুলিশ এখনও মাহবুব ও সাগরকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি।

চেপে ধরে মাহবুব-মাসুদ, জবাই করে সাগর

ব্যাংকের ভিডিও ফুটেজ এবং আরিফ ও গিয়াসকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ বিবরণ পেয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা ‍জানান, বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাত ২টা ২৪ মিনিটের দিকে ব্যাংকের পেছনের দিকের জানালার গ্রিল কেটে তিনজন ভেতরে প্রবেশ করে। তিনজন হল, মাহবুব, মাসুদ ও সাগর। আর গিয়াস ছিল বাইরে তদারকির দায়িত্বে। পুরো ঘটনার নেতৃত্বদাতা গিয়াস।

তিনজন যখন ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে তখন ক্যাশ শাখার সামনে মেঝেতে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন নিরাপত্তারক্ষী মো.ইব্রাহিম। ঢুকেই ঘুমন্ত ইব্রাহিমের মাথায় আঘাত করে মাসুদ। আঘাতের পর ইব্রাহিম ধড়মড়িয়ে উঠলে মাসুদ তার মাথা ও মুখ চেপে ধরে। মাহবুব তার দুই পা চেপে ধরে। আর সাগর গলা কেটে তাকে খুন করে।

এরপর সাগর নিরাপত্তারক্ষীর মোবাইল সেটটি নিজের হেফাজতে নেয়। পরে তারা ব্যাংকের ভল্ট ভাঙার চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তারা আবারও গ্রিল কাটা জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। ব্যাংকের ভেতরে তারা ছিল ২৩ মিনিট। সব মিলিয়ে তাদের সময় লাগে ৪০ মিনিটের মত।

খুন হওয়া নিরাপত্তারক্ষী মো.ইব্রাহিম (৩৪) চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভার আলী আহমদের ছেলে। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।