এক টানা দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে বিএনপি। ক্ষমতার বলয় থেকে জন্ম নেওয়া দলটি আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে ক্ষমতায় যেতে না পারলে টানা ৯ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর টানা ৮ বছর ৩ শ’ ৬১ দিন ক্ষমতার বাইরে ছিলো বিএনপি।

বিএনপির প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায় আরোহণ, ক্ষমতাচ্যুতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতা বলয়ের মধ্যে থেকেই ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। অর্থাৎ জন্মের আগেই ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পায় বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি।

কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সেনা অভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু হলে ক্ষমতা বলয় থেকে ছিটকে পড়ে বিএনপি।এর পর দলটির আপদকালীন চেয়ারম্যান রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতাচ্যুত হলে পুরোপুরি রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে চলে যায় দলটি।

দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে পায় বিএনপি।এরই মধ্যে কেটে যায় ৮ বছর ৩ শ’ ৬১ দিন। অর্থাৎ ৯ বছর পূর্তির ৪ দিন আগে ক্ষমতায় পূন:আরোহণের সুযোগ পায় সেনা ছাউনিতে জন্ম নেওয়া এই রাজনৈতিক দলটি।

এর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ৫ বছরের জন্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায় বিএনপি। তবে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে পার্লামেন্টে থাকার সুযোগ মেলে তাদের।
ক্ষমতার পালাবদলে ২০০১ সালে আবারও ক্ষমতাসীন হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী  জামায়াতকে সঙ্গী করে ক্ষমতারোহন সুখকর হয়নি দলটির জন্য।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করা জামায়াতকে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার করে ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসা বিএনপি একটু একটু করে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য থেকে সরতে থাকে। যা দলটি অর্জন করেছিলো খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

অতঃপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র চালান, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, টানা পাঁচ বার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন ও জঙ্গিবাদের উত্থান বিএনপিকে দীর্ঘকালের জন্য ক্ষমতা বলয়ের বাইরে পাঠানোর আগাম বার্তা শোনাতে থাকে। সূত্রমতে, অবস্থা বেগতিক দেখে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে দলের সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্যোগ নেন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া।

কিন্তু বিরোধী জোটের তীব্র আন্দোলনের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হন তিনি। দলীয় মনোনয় পাওয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ আজিজও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।

হিসাব করে দেখা গেছে, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর ইয়াজ উদ্দিনের ওই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা বলয়ের বাইরে যাওয়া বিএনপি আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে ক্ষমতায় যেতে না পারলে টানা ৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার রেকর্ড অতিক্রম করবে। এর পর দলটির সামনে কেবল ক্ষমতার বাইরে থাকার রেকর্ড বাড়ানোর পালা।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, টানা ৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দলের জন্য অস্বাভাবিক। তারপরও ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে। বিএনপির কিছু ভুল ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে এটি ঘটলেও পারিপার্শ্বিক আরো অনেক বিষয় এর সঙ্গে জড়িত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি ক্ষমতাহারা হলেও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত শক্তির সহযোগিতা পেয়েছিলো। ফলে দুঃসময় কাটিয়ে উঠে   ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংখ্যাধিক্যের জোরে ক্ষমতায় ফেরা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়।

কিন্তু এবার বিএনপির সঙ্গী স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত। যার ফলে দাবি আদায়ের আন্দোলনে বার বার হোঁচট খাচ্ছে দলটি। সঙ্গত কারণেই আগামী ২৯ অক্টোবর তো দূরের কথা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেও বিএনপির ক্ষমতারোহনের সম্ভাবনা দেখছেন না রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যাদের আস্থা নেই, তাদের সহযোগিতায় ক্ষমতায় বসা বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে গেছে। জামায়াতকে ছেড়ে মূলধারার রাজনীতিতে আসতে না পারলে ক্ষমতার জন্য বিএনপির অপেক্ষা আরো দীর্ঘ হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমরাও বুঝি। জামায়াত স্বাধীনতার চেতনায় এখনো বিশ্বাস করে না। আন্দোলন কর্মসূচি দিলেই তারা অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করে। কিন্তু সবাইকে মনে রাখতে হবে, বিশেষ এক প্রয়োজনে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিকে জোট বাঁধতে হয়েছে এবং এটি সাময়িক সময়ের জন্য।