লিবিয়ায় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে অপহৃত নয়জন বিদেশি নাগরিকের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন। অপহৃত ব্যক্তিদের মরুভূমিতে নিয়ে গেছে অপহরণকারীরা।
বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, অপহরণকারীরা আইএসের সদস্য। তবে অপহৃত ব্যক্তিদের কর্মস্থল অস্ট্রিয়ার প্রতিষ্ঠান ভিওএএস অপহরণকারীদের ‘অজ্ঞাতনামা মিলিশিয়া গ্রুপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, অপহৃত দুই বাংলাদেশির মধ্যে এর আগে জামালপুরের হেলাল উদ্দিন সম্পর্কে জানা গিয়েছিল। গতকাল মঙ্গলবার জানা গেছে, অপহৃত অন্য বাংলাদেশি হলেন নোয়াখালীর আনোয়ার হোসেন।
আনোয়ারের অপহৃত হওয়ার খবরে তাঁর পরিবার রয়েছে চরম উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠায়। দুই বাংলাদেশিকে উদ্ধারের জন্য সরকার লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি তিউনিসিয়ায় অস্ট্রিয়ার দূতাবাস ও শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র অস্ট্রিয়ার তেল প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতা নিচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. শহীদুল হক গতকাল সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতিষ্ঠান ভ্যালু অ্যাডেড ওয়েলফিল্ড সার্ভিসেস (ভিওএএস) এক প্রতিবেদনে দূতাবাসকে জানিয়েছে, অপহৃত ব্যক্তিদের মরুভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভিওএএসের পাশাপাশি লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি ও তিউনিসিয়ায় অবস্থিত অস্ট্রিয়ার দূতাবাসের আপৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অপহরণকারীদের আইএস বলা হচ্ছে। তবে ভিওএএসের প্রতিবেদনে অপহরণকারীদের ‘অজ্ঞাতনামা মিলিশিয়া গ্রুপ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, নামের মিল থাকায় আনোয়ার হোসেনকে প্রথমে সুদানের নাগরিক মনে করা হচ্ছিল। পাশের তেলখনিতে কর্মরত অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। অপহৃত দুই বাংলাদেশিকে উদ্ধারের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর আশরাফুল ইসলাম গতকাল লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
৬ মার্চ লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সির্তে শহরের আল ঘানি তেলখনিতে বন্দুকধারী জঙ্গিরা হামলা চালায়। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগেই জঙ্গিরা ১১ জন নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করে। পরে সেখান থেকে দুই বাংলাদেশিসহ নয়জন বিদেশিকে জিম্মি করে নিয়ে যায় তারা।
লিবিয়ার সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তার যথেষ্ট অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে গেছে যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছাড়া অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতেরা লিবিয়ায় অবস্থান করছেন না। ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ প্রতিবেশী তিউনিসিয়ায় দূতাবাসের কর্মকাণ্ড সরিয়ে নিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আল ঘানির তেলখনিতে হামলার পর পাশের তেলখনিতে কর্মরত অন্য ২১ জন বাংলাদেশিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাস নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
জানা গেছে, বর্তমানে লিবিয়ায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। গত জুনে সংঘাত শুরুর আগে লিবিয়ায় ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অবস্থান করতেন। পরে তাঁদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ জাতিসংঘ শরণার্থী কমিশনের পরিচয়পত্র পাওয়ার পর ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে চলে গেছেন।
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আনোয়ারের পরিবার: নোয়াখালী অফিস জানায়, লিবিয়ায় অপহৃত আনোয়ারের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের কাদিপুর ইউনিয়নের গয়েছপুরে। তাঁর স্ত্রী মারুফা খাতুন দুই সন্তান রাহিম (৬) ও রাইমাকে (৪) নিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে বসবাস করেন। মারুফার বড় ভাই মাহমুদ ইকবাল জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর বোনের সঙ্গে মুঠোফোনে আনোয়ার হোসেনের সর্বশেষ কথা হয়। পরদিন তিনি ফোন করবেন বলে স্ত্রীর মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠালেও ফোন করেননি। এরপর কয়েকবার তাঁর বোন ফোন করলেও স্বামীর ফোন বন্ধ পান।
মাহমুদ ইকবাল জানান, গতকাল দুপুরের পর লিবিয়া থেকে আনোয়ার হোসেনের এক বন্ধু এনামুল হক মারুফাকে ফোন করে তাঁর স্বামী অপহৃত হওয়ার খবর জানান।
ছেলে অপহৃত হওয়ার খবরে গ্রামের বাড়ি কাদিরপুর ইউনিয়নের গয়েছপুরে আনোয়ারের বৃদ্ধ বাবা ইউনুছ মিয়া ও মা আফরোজা বেগম চরম উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। চার ভাইবোনের মধ্যে আনোয়ার দ্বিতীয়। তাঁর মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কে বা কারা আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে, আমরা জানি না। আমরা আমাদের ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই। সরকার যেন আমাদের ছেলেকে উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে আনোয়ার হোসেন চাকরি নিয়ে প্রথমে লিবিয়া যান। ২০১১ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন। ৩৬ দিন পর ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আবার লিবিয়ায় যান তিনি।

তথ্যঃ প্রথমআলো