থাইল্যান্ডের পর এবার মালয়েশিয়ায় অন্তত ৩০টি গণকবরের সন্ধান পেয়েছে দেশটির পুলিশ। রোববার মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাহিদ হামিদি গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। দেশটির পেরলিস প্রদেশের পেদাং বেসারে পাচারকারীদের প্রায় ১৭টি ক্যাম্পে এসব গণকবরের সন্ধান মিলে। মালয়েশিয় পুলিশের ধারণা, সেখানে শতাধিক বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসী-প্রত্যাশীর দেহাবশেষ থাকতে পারে। যারা পাচারকারীদের খপ্পরে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি ছিলেন। ভয়ঙ্কর নির্যাতন আর অনাহারে অসুস্থ হয়ে এসব অভিবাসীরা মারা যান। পরে তাদের গণকবর দেয় পাচারকারীরা। গণকবরের বিষয়ে দেশটির পুলিশ প্রধান আজ সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবেন। ১ মে থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে মানব পাচারকারীদের অনুরূপ ক্যাম্পেও গণকবর আবিষ্কৃত হয়। সেখান থেকে পায় ৩০টির বেশি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। এদিকে মালয়েশিয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সাগরে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে ইন্দোনেশিয়া। প্রেসিডেন্ট জোকো ইউদোদোর নির্দেশের পর দেশটির সশস্ত্র বাহিনী এ উদ্ধার অভিযান শুরু করে। থাইল্যান্ডের ফুকেত উপকূল ব্যবহার করে মার্কিন নৌবাহিনীর উদ্ধার অভিযানে অসম্মতি জানিয়েছে থাই সেনাবাহিনী। খবর এএফপি, বিবিসি, ব্যাংকক পোস্ট ও রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের।

 রোবাবর এক অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাহিদ হামিদি বলেন, পেরলিস প্রদেশের থাই সীমান্ত সংলগ্ন পেদাং বেসার ও ওয়াং কেলিয়ান এলাকায় পাচারকারীদের ১৪টি বড় আকারের এবং তিনটি ছোট ক্যাম্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো অন্তত পাঁচ বছর ধরে চালু ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, পাচারকারীদের ওই ক্যাম্পে গণকবরের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ।
হামিদি বলেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও উপ-মহাপরিদর্শক এখন সীমান্তের ওই এলাকায় আছেন। ওগুলো পাচারের শিকার হওয়া অবৈধ অভিবাসীদের কবর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশ সেখানে অভিযান শুরুর আগেই পাচারকারীরা পালিয়ে যায়। তবে পুলিশ ও ভ্যাট ৬৯ কমান্ডো বাহিনী ওই এলাকায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এ কাজে তারা থাইল্যান্ডের সহায়তা নিচ্ছে।
তবে গণকবরে কত মানুষের দেহাবশেষ আছে এ ব্যাপারে হামিদি কিছু উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, পুলিশ কমিশনার শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানাবেন।
এ ব্যাপারে মালয়েশীয় পুলিশও গোপনীয়তা রক্ষা করছে। তারা এখনই বিস্তারিত কিছু জানাতে অস্বীকার করেছে। তবে স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, পেদাং বেসারের যেখানে গণকবর পাওয়া গেছে, সেটি একটি সংরক্ষিত এলাকা। সেখানে সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার নেই। পাহাড়ি ওই এলাকা এখন ঘিরে রাখা হয়েছে। পুলিশ প্রধান আজ সংবাদ সম্মেলন করে গণকবর সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন।

এদিকে মালয়েশিয়ান ভাষার সংবাদপত্র ইউতুসান মালয়েশিয়াতে বলা হয়েছে, জায়গাটি কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার উত্তরে। সেখানে প্রায় ৩০টি গণকবরের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। যেখানে শতাধিক মানুষের দেহাবশেষ থাকতে পারে।

 মালয়েশিয়া সীমান্তের যে অংশে এসব গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে, তার উল্টোদিকে থাইল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকার নামও পেদাং বেসার। শংখলা প্রদেশের ওই এলাকাতেই গত মাসে কয়েকটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর মানব পাচারে জড়িত সন্দেহে জেলার মেয়রকেও গ্রেফতার করা হয়।

ধারণা করা হয়, বিভিন্ন স্থান থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নৌকায় করে প্রথমে আনা হয় থাইল্যান্ডে। সেখানে জঙ্গলের মধ্যে পাচারকারীদের বিভিন্ন ক্যাম্পে তাদের রাখা হয়। পরে সময় সুযোগমতো তাদের আবার নৌকায় করে অথবা স্থলপথে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানো হয়। আর এক্ষেত্রে শংখলা প্রদেশ ও পেদাং বেসারের ওই দুর্গম এলাকা পাচারকারীদের একটি রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

 সম্প্রতি বিবিসির সাংবাদিক জনাথন হেডের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরো থাই সমাজ বিভিন্নভাবে মানব ব্যবসায় জড়িত। তবে মালয়েশিয়ায় এই প্রথম গণকবরের সন্ধান মিলল, যদিও কিছুদিন আগে দেশটির সরকার দাবি করেছিল, সেখানে পাচারকারীদের কোনো ক্যাম্প নেই।
ইন্দোনেশিয়ার উদ্ধার অভিযান শুরু : সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের উদ্ধারে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে ইন্দোনেশিয়া। নৌবাহিনীর ৪টি জাহাজ, দুটি বড় বোট ও একটি টহল বিমান এ অভিযানে অংশ নিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ফুয়াদ বাসিয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুসন্ধান অভিযান শুরু হলেও কার্যত রোববার থেকেই পূর্ণোদ্যমে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে তারা। ওই মুখপাত্র বলেন, আমরা প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর কাছ থেকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনার নির্দেশ পেয়েছি। ইন্দোনেশিয়ার জলসীমা বা আন্তর্জাতিক সমুদ্রে সমানভাবে চলবে এ অভিযান।

ফুয়াদ আরও বলেন, আমরা অভিবাসীদের উদ্ধার করে তাদের তীরে নিয়ে যাব। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিবাসীদের বহনকারী নতুন কোনো বোট চোখে পড়েনি বলে জানান ওই সেনা মুখপাত্র।

 এর আগে অভিবাসী ভর্তি নৌযান উপকূল থেকে তাড়িয়ে দিলেও গত বুধবার থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের পর আগের অবস্থান থেকে সরে আসে তিনটি দেশ। রোববার পর্যন্ত তিনটি দেশে প্রায় ৩০১৬ জন অভিবাসী উদ্ধার হয়েছে। যারা দেশগুলোর বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ইন্দোনেশিয়া মনে করে এখনও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাগরে প্রায় ৭ হাজার অভিবাসী নৌযানে ভাসছেন।

মার্কিন উদ্ধার অভিযানে থাইল্যান্ডের অসম্মতি : থাইল্যান্ডের ফুকেত উপকূল ব্যবহার করে মার্কিন উদ্ধার অভিযানে অসম্মতি প্রকাশ করেছে থাই সেনাবাহিনী। গত কিছুদিন ধরে ওই এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর একটি দল প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিল। বুধবার ওই প্রশিক্ষণ শেষ হবে। থাই সেনাবাহিনী বলছে, মার্কিন নৌবাহিনীর ওই দলটিকে শুক্রবারের মধ্যে ওই অঞ্চল ত্যাগ করতে হবে। থাইল্যান্ড তাদের ভূমি ব্যবহার করে মার্কিন উদ্ধার অভিযানে রাজি নয়।

 এদিকে থাইল্যান্ডে ৭৭ জন অভিযুক্ত মানব পাচারকরীর মধ্যে এখন ৪৬ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি।

মিয়ানমারে জনসংখ্যা আইন নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনের আশঙ্কা : মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বিতর্কিত জনসংখ্যা আইনের অনুমোদন দেয়ায় সেখানে বসবাসরত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। শনিবার প্রেসিডেন্ট থেইন ওই আইনে অনুমোদন দেন। যদিও তাতে অনুমোদন না দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করেছিলেন।

 মানবাধিকার সংগঠন মনে করছে, ওই আইনের ফলে নিপীড়নের শিকার হতে পারেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং নারীরা। দ্য পপুলেশন কন্ট্রোল হেলথ কেয়ার বিলটি আইনে পরিণত হওয়ায় মায়েদের একটি বাচ্চা জন্মদানের ব্যবধান তিন বছর হতে হবে। দেশটিতে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান থাকলেও ১১ লাখই রাষ্ট্রহীন অবস্থায় আছেন। স্থানীয় বৌদ্ধদের নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা অনেক আগে থেকেই দাবি করে আসছে যে, রোহিঙ্গারা জনসংখ্যায় বাড়ছে। ফলে তাদের জন্য সেটা আতংক হয়ে দেখা দিতে পারে। এজন্য তারা মুসলমান সমাজে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বাড়ানোর আহবান জানিয়ে আসছিলেন। এখন জনসংখ্যা আইনের ফলে তাদেও সেই দাবিই বাস্তবায়িত হল। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইন নারীদের সন্তান জন্মদানের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করবে।

মিয়ানমারের তালিকা অসম্পূর্ণ : গত শুক্রবার মিয়ানমার উপকূলে দেশটির নৌবাহিনীর হাতে আটক ২০৮ জন অভিবাসী বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছিল দেশটি। উদ্ধার ওইসব অভিবাসীর একটি তালিকা বাংলাদেশকে পাঠিয়েছে মিয়ানমার। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দেয়া ওই তালিকা অসম্পূর্ণ হবে দাবি করেছে বিজিবি। কারণ ওই তালিকার তথ্য দেখে তারা কোন দেশের নাগরিক তা যাচাই করা যায় না। রোববার সংবাদ সম্মেলনে বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. খালেকুজ্জামান বলেন, আমাদের ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দল মিয়ানমার যাওয়ার কথা থাকলেও যায়নি। বিকালে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ২০০ জনের একটি তালিকা আমরা হাতে পেয়েছি। ওই তালিকাটি অসম্পূর্ণ। তিনি আরও বলেন, তালিকাটি বিজিবির সদর দফতরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

 মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গা বৈষম্যের ইতি টানতে হবে : মিয়ানমার উপকূলে উদ্ধার ২০৮ জনের মধ্যে ৮ জন রোহিঙ্গা বলে নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, উদ্ধার ওই সব লোককে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের ইসলামিক স্কুলে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের খবার-পানি দেয়া হয়েছে। রোববার জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ উপদেষ্টা বিজয় নামবিয়ার তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি বলেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গা বৈষম্যের ইতি টানতে হবে। এটা অবশ্যই মনে করতে হবে, এই মুসলিম সম্প্রদায় এই দেশের জন্যই কাজ করবে।