দেশে কম্পিউটার ও স্মার্ট ফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে ডিজিটাল বইয়ের (ই-বুক) ব্যবহার ও জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে। এ জনপ্রিয়তাকে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকের ক্ষেত্রে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসাবে আগামী শিক্ষাবর্ষ অর্থাত্ ২০১৬ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচলিত বাঁধাই করা বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল বইও প্রকাশ করা হবে। পর্যায়ক্রমে স্কুল ও কলেজের অন্যান্য শ্রেণির জন্যও ডিজিটাল পাঠ্যবই প্রকাশ করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গত ৪ মে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন। এ প্রসঙ্গে গত বুধবার তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ডিজিটাল বই আমাদের তরুণ-কিশোরদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ধরনের বই সহজে ব্যবহার করা যায়। শিক্ষার্থীরা আনন্দের সাথে ও আগ্রহ নিয়ে এ সংস্করণের বই ব্যবহার করছে। এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে পড়াশোনায় আরো মনোযোগী করতে ডিজিটাল পাঠ্যবই প্রবর্তন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কাগজে তৈরি প্রচলিত বইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল সংস্করণও বের হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা এ সংস্করণে অভ্যস্ত হতে সময় পাবে।
মন্ত্রণালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ক ‘টিকিউআই’ প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল বই তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের শিক্ষকদের মাধ্যমে এ বই প্রস্তুত করার কাজ শুরু হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পটির পরিচালক বনমালী ভৌমিক বলেন, ২০১৬ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ডিজিটাল বই তুলে দেয়া হবে। এগুলোকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে এখন কাজ চলছে। এ বইগুলোতে কাগজের বইয়ের চেয়ে বেশি ব্যাখ্যামূলক শিক্ষা সংযুক্ত করা সহজ হবে। শব্দার্থ, ব্যাখ্যা, এনিমেশন, রঙ্গিন ছবি, প্রয়োজনীয় ভিডিও সংযুক্তি বইগুলোকে আরো সহজ ও আনন্দময় করে তুলবে।
জনপ্রিয় হচ্ছে ই-বুক: বই বলতে শুধু কাগজে ছাপা বই চিন্তা করার দিন অনেক আগেই ফুরিয়েছে। বইয়ের ধরন-মাধ্যমে পরিবর্তনের পাশাপাশি বদলাতে শুরু করেছে পাঠকের পাঠাভ্যাস ও পাঠের মাধ্যমও। বিশ্বজুড়ে বইয়ের দুনিয়ায় বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ডিজিটাল বই বা ই-বুক। সেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশেও।
ঢাকা কোর্টে আইন প্র্যাকটিস করেন এডভোকেট হুমায়ুন কবির। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে আদালতে পৌঁছতে তার সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। আগে পাঠ্যবই পড়তেন চেয়ার-টেবিলে বসে, সাহিত্যের বই পড়তেন বিছানায় শুয়ে। এখন যানজটের ঢাকায় গাড়িতে বসেই মোবাইলে আইন বিষয়ক বই পড়েন। সংবাদপত্রও পড়েন। হুমায়ুন বললেন, ‘ঢাকার রাস্তায় নাগরিক জীবনের অনেকটা সময় অলস কেটে যায়। ই-বই পড়া সময় কাটানোর ভালো উপায়।’
এভাবেই মোবাইলে নিজেদের সুবিধামত বই পড়তে পারায় পাঠকের পাঠাভ্যাসও বদলে যেতে শুরু করেছে।  কাজের ফাঁকে বই পড়াকে জনপ্রিয় করতে ই-বুক বড় মাধ্যম হতে পারে। এছাড়া যেসব বই দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশিত হয় না বা পাওয়া যায় না, সেগুলোও অনলাইনে পাওয়া সহজ হয়ে গেছে। ফলে পাঠের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করা পাঠকের জন্য সহজ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামীতে কাগজে ছাপানো বইয়ের সংখ্যা হয়তো কমবে না, কিন্তু দাপট বাড়বে ডিজিটাল বইয়ের। সাম্প্রতিক দেশি-বিদেশি বই মেলায় ছাপা বইয়ের সাথে সাথে ডিজিটাল বইয়ের কাটতিই এর বড় প্রমাণ।
প্রাচীন অ্যাসিরিয়া ও ব্যাবিলনে  প্রথমে পাথরে খোদাই করে লেখার প্রচলন শুরু হয়। এরপর কাদা মাটির উপর লিখে তা পুড়িয়ে ইটের মত শক্ত করা হত। ব্যাবিলনের এক প্রাচীন লাইব্রেরি থেকে ২২ হাজারেরও বেশি পাথরে খোদাই করা কিংবা পোড়া মাটির ফলক উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাচীন মিশর ও গ্রীসে প্যাপিরাস কাগজে লেখা বই থেকে গাছের বাকল কিংবা পাতায় লেখা বইয়ের ঘটনাও এখন দূর ইতিহাস। কাছের ঘটনা নয় চীনে কাগজের উদ্ভাবনও। পাথর, মাটি, বাকল, পাতা, কাগজ পেরিয়ে এখন সেই বই এসেছে ডিজিটাল রূপে।
দেশে ডিজিটাল বই ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় এক যুগের। প্রথম দিকে সাহিত্য কিংবা বিজ্ঞান বিষয়ক বইগুলোরই পিডিএফ সংস্করণ বের হতো। অনেকটা ব্যক্তি উদ্যোগেই এ ধারার শুরু। এরপর বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল বই প্রকাশ শুরু করে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র কিংবা ব্রিটিশ কাউন্সিল এর মত খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলোও ডিজিটাল বই প্রকাশ ও পাঠের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
বইয়ের ধরন: শুরুর দিকে ডিজিটাল বই বলতে শুধু পিডিএফ আকারের বইকেই বোঝাত। এই ধরনের বই এখনও অনেক জনপ্রিয় এবং ইন্টারনেটে-ওয়েবসাইটে এ ধরনের বই এখনও সবচেয়ে বেশি। গবেষকরাও নিজেদের গবেষণালব্ধ ফলাফল ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশের জন্য পিডিএফকেই বেছে নেন। দেশের অনেকগুলো ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে চিরায়ত ও আধুনিক সাহিত্য-বই পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো ওয়েবসাইটে নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে ডিজিটাল বা পিডিএফ বই সংগ্রহ করা যায়।
এখন ইন্টারনেটে ডিজেভিউ, উইনডোভিউ, বুকভিউ ফরম্যাটেও ডিজিটাল বই পাওয়া যায়। এগুলোর সুবিধাজনক দিক হলো একসাথে একাধিক পৃষ্ঠা ও ছবি ছোট-বড় করে দেখা যায়। বাঁধাইকরা বইয়ের মতই দেখতে এ ধরনের বই। এছাড়া ওয়ার্ড ফাইলেও বই পাওয়া যায়। তবে এ ধরনের বইয়ে অনেক সময় সম্পাদনা ত্রুটি থাকে বলে অনেকে পছন্দ করেন না।
বর্তমানে স্মার্ট ফোনের বাজার বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে ডিজিটাল বইয়ের বাজারও। পিডিএফ কিংবা ডিজেভিউ ধরনের বইকে পিছনে ঠেলে দিয়ে সামনে চলে আসছে অ্যাপস (অ্যাপ্লিকেশন) আকারের বই। দেশে অ্যাপস বই ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে। এ ধরনের বইয়ে অধ্যায়ভিত্তিক ও বিষয়ভিত্তিক পড়শোনা করা সহজ। দেশের সংবাদপত্রগুলোও ইন্টারনেট সংস্করণ, ই-পেপারের পাশাপাশি অ্যাপসও চালু করেছে। ফলে পাঠক হাতের মুঠোতেই পেয়ে যাচ্ছে বইয়ের দুনিয়া, তথ্যের পৃথিবী।
বই পড়ার যন্ত্র: সনাতনি কম্পিউটার ছাড়াও ডিজিটাল বই পড়ার জন্য ই-বুক রিডার সবচেয়ে জনপ্রিয়। এটি ছোট, হালকা ও সহজে বহনযোগ্য। আমাজনের কিন্ডল এবং সনির ই-রিডারের কাটতিই বেশি। হালনাগাদকৃত ই-রিডারগুলোতে ওয়াইফাই সংযোগ পদ্ধতিও যুক্ত রয়েছে। ফলে ইন্টারনেট থেকে সহজে ই-বুক পড়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। পেঙ্গুইন, অক্সফোর্ড, ক্যামব্র্রিজ’র মত বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলো এখন বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ বের করছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ বের করা শুরু করেছে। তারা স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ের সাথে ডিজিটাল সংস্করণ সিডি আকারেও বিক্রি করছে। অনেকে ইন্টারনেটের সাইটে নিজেদের বই হুবহু তুলে দিয়েছেন। তবে দেশে বর্তমানে স্মার্ট ফোনগুলোই ই-রিডার হিসেবে ব্যবহার করছেন অধিকাংশ পাঠক।