ক্যান্সার প্রতিরোধের এক নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করলো বিজ্ঞানীরা। জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত এক ভাইরাসের মাধ্যমে তার এ পদ্ধতির প্রয়োগ করে। বিজ্ঞানীদের দাবি, আগামী কয়েক দশকে ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য এই পদ্ধতিই হবে প্রথম ধাপ।

এনএইচএস রয়েল মার্ডসেন হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিউট অফ ক্যান্সার রিসার্চ জানিয়েছে যে পরিবর্তিত হার্পস ভাইরাসের (ঠান্ডা জ্বরের ভাইরাস) মাধ্যমে চিকিৎসা করা ক্যান্সার রোগীদের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। ভাইরাসটির নাম টি-ভেক(T-Vec)

কিছু কিছু রোগীর মাঝে এর প্রভাব ছিলো অবিশ্বাস্য। তাদের অনেকেই যাদের ভাইরাসের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়নি তাদের চেয়ে ২০ মাস বেশি বেঁচে ছিলেন। অন্যান্য রোগীদের মাঝে এর প্রভাব ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু একথা নিশ্চিত যে এই ভাইরাসের মাধ্যমেই ক্যান্সার চিকিৎসার এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

ক্যন্সার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য এই ভাইরাসই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকরী হাতিয়ার।

এই পদ্ধতিটিকে বলা হচ্ছে ইমিউনোথেরাপি। এ পদ্ধতিতে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকে ভাইরাসগুলো আক্রমণ করে। ভাইরাসগুলো জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত থাকায় এটি কোনো সুস্থ্ কোষে আক্রমণ করতে পারে না। শুধুমাত্র ক্যান্সার আক্রান্ত কোষেই এটি বাসা বাঁধে। তারপর ভাইরাসটি সেখানে বংশবৃদ্ধি করে। একটা সময় এটি ফেটে বের হয়ে আসে। শরীরে অভ্যন্তরীণ শক্তি বা রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই এটি মূলত টিউমার ধ্বংস করে।

অন্যান্য ইমিউনোথেরাপিগুলোও প্রায় একইরকম। এটি মূলত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। আশা করা হচ্ছে টি-ভেক নামক এই ভাইরাস ও শরীরের অ্যান্টিবডি সমন্বয়ে একটি নতুন ও কার্যকরী পদ্ধতি আবিস্কার করা সম্ভব হবে।

আমেরিকান ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানি আমগেন এর এই উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি ইতোমধ্যেই ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ রেগুলেটরিতে জমা দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ভাইরাল ইমিউনোথেরাপির ওপরেও গবেষণা করা হচ্ছে।

বায়োলজিক্যাল ক্যান্সার থেরাপি বিশেষজ্ঞ যুক্তরাজ্যের কেভিন হারিংটন বলেন, একবছরের মধ্যেই এই পদ্ধতিটি অনেক দেশেই চালু করা হবে। এখন শুধু ইউকে রেগুরেটরি কমিটির ছাড়পত্রের অপেক্ষা।

কেভিন বলেন, ‘এক্ষেত্রে প্রায় দুই দশক কাজ করার পর এখন আমি আশা করতে পারি যে এখন সত্যিই দারুণ কিছু শুরু হতে যাচ্ছে। আশা করি প্রথম ধাপেই আমরা সফলতা পাবো যেন এর উপরে আমরা আরও গবেষণা করতে পারি।

আইসিআর এর প্রধান নির্বাহী প্রফেসর পল ওয়ার্কম্যান বলেন, ‘আমরা হয়তো মনে করতে পারি ভাইরাস আসলে মানবজাতির শত্রু। কিন্তু এটাও সত্যি যে তাদের ধ্বংস করার ক্ষমতা ক্যান্সার আক্রান্ত কোষকে ধ্বংস করতে পারে এবং ক্যান্সারের চিকিৎসা ত্বরান্বিত করতে পারে।’

ক্লিনিকাল অনকোলোজিতে প্রকাশিত হওয়া জার্নালে বলা হয়, ৪৩৬ জন ক্যান্সার রোগীর উপর এ পরীক্ষা চালানো হয় এবং ১৬ শতাংশ রোগী ছয়মাসের মধ্যেই এর সুফল ভোগ করতে শুরু করেন। কিছু কিছু রোগী তিন বছর পরেও এর সুফল ভোগ করছেন এবং ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে আছেন।

ক্লিনিক্যাল অনকোলোজি’র প্রফেসর অ্যালান মেলচার জানান, গত কয়েক বছরে ক্যান্সার চিকিৎসায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। তিনি বলেন, ‘ভাইরাসগুলোকে প্রথমে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিলো যেন তারা শুধু ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকেই আক্রমণ করে এবং সুস্থ কোষগুলোর ক্ষতি না করে। তবে এটি স্পষ্ট যে ভাইরাসগুলো শরীরের রোগ প্রতিরাধ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়ছে।’

যুক্তরাজ্যের ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার এর সাইন্স ইযনফরমেশন ম্যানেজার ড. হারলি ফ্রেন্ড জানান, আগে ধারণা করা হতো টি-ভেক ভাইরাস শুধু ত্বকের ক্যান্সারের জন্যই কার্যকরী হবে। তবে এখন এটি প্রমাণিত যে এই ভাইরাস ক্যান্সার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বাড়ায়।

তাই গবেষণার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে এই ভাইরাসটি সম্পর্কে আরো ভালো করে জানা। খুঁজে বের করা যে কেন শুধু নির্দিষ্ট কোনো রোগীর উপর এটি কাজ করছে। কেন সবার উপর নয়। তাই এর উপর আরো গবেষণা প্রয়োজন বলেও জানালেন ড. ফ্রেন্ড।

মেলানোমা যুক্তরাজ্যের ৫ম সাধারণ ক্যান্সার। দিনদিন এর পরিধি বাড়ছে এবং অনেক মানুষ এর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। এখনো যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার মানুষ এই ক্যান্সারে মারা যান।