থাইল্যান্ডের জঙ্গলে প্রায় দশ বাংলাদেশির লাশ মিলেছে। এই হতভাগ্যদের মালয়েশিয়া নেওয়ার পথে জিম্মি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ। তবে এমন চিত্র শুধু মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার লোভেও এভাবেই প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশিরা।

ইউরোপে পাড়ি দেবার পর্বটা শুরু হয় মূলত ইউরোপের দেশগুলোতে ভাল আয়, উন্নত জীবন, ব্যবসা করার সুবিধা, সহজেই বৈধ হওয়ার সুযোগ—এমন সব অবাস্তব স্বপ্ন দেখে। তবে সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু হয় প্রতারক-দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে। কখনোবা প্রাণ হারিয়ে।

ইউরোপের দেশ গ্রিস বা ইতালিতে কর্মরত পরিচিতদের ডাক পেয়ে জীবন বাজি রেখে অবৈধভাবে  বিভিন্ন দেশের সীমান্ত পেরুনোর বিপজ্জনক পথে পা বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা। অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে পাচারকারী দালালরা বলে ‘গেম’। কিন্তু এই ‘গেম’-এর অংশ হবার পর  প্রতারকদের হাতে জিম্মি হয়ে সে ঘোর কাটে তাদের। তখন আর করার কিছু থাকে না। দালাল-প্রতারকদের হাতে জিম্মি হয়ে পথে পথে দফায় দফায় লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ গুনতে হয়। ততদিনে পরিবার হারায় শেষ সম্বলটুকুও।

এভাবেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করার সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলেছে দালালরা। এই চক্রের কার্যক্রম মূলত ইরান ও তুরস্কভিত্তিক। অন্য কোনো দেশের নয়, এই চক্রটি চালায় মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি দালালরা। অর্থাৎ খোদ বাংলাদেশিদের হাতেই জিম্মি হয় বাংলাদেশিরা। আর এদের সহযোগী হিসেবে থাকে ওইসব দেশের কিছু দালাল। এদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অনেক বাংলাদেশির পাচারের অন্যতম রুট। ওমান থেকে পাচার চলে স্থল ও সমুদ্রপথে। এই প্রতিবেদনে মূলত ওমান থেকে তুরস্কে পাচার হওয়া বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশিদের যে দেশেই জিম্মি করা হোক না কেন, মুক্তিপণের অর্থ লেনদেন কিন্তু হয় বাংলাদেশের মাটিতেই। দাবি অনুযায়ী অর্থ দিতে না পেরে প্রাণও হারিয়েছেন অনেক শ্রমিক।

মূলত গ্রিস যাওয়ার অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট তুরস্ক। ওমান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় সাগর, পাহাড়, মরুভূমি আর বরফে ঢাকা দুর্গম বিপদসঙ্কুল পথ। এক দেশের সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে অনুপ্রবেশের পর দালালদের হাতবদল হয়। সীমান্ত পেরনোর সময় এক দেশের দালালরা অন্য দেশের দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এভাবে চলে কয়েক দফা হাতবদল ও মুক্তিপণ আদায়।প্রতিটি গ্রুপের কাছেই শ্রমিকদের গুনতে হয় আলাদা আলাদা মুক্তিপণ।

ওমান থেকে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে যেতে হয় ইরান।সেখান থেকে বিপদসঙ্কুল স্থলপথে পাহাড়-জঙ্গল-মরুভূমির দুস্তর পথ পেরিয়ে অবশেষে তুরস্ক সীমান্ত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তুরস্ক পৌঁছানোর এটাই দালালদের রুট।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে শহরে গিয়ে দেখা মেলে পাচার হওয়া বেশ কিছু বাংলাদেশির সঙ্গে। পাচারকারী দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে নানা দুর্ভোগ নির্যাতন সয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে তুরস্কের পৌঁছান এসব হতভাগ্য বাংলাদেশি। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত কুচুক বাজারে বসে তারা বর্ণনা করেন অবর্ণনীয় কষ্টভোগের কথা। এক কাপড়ে, দিনের পর দিন না খেয়ে, দালালদের অত্যাচার সহ্য করে তারপর ইস্তাম্বুল। কখনো স্পীডবোট, কখনো পায়ে হেঁটে পাড়ি দেওয়া সেসব পথের বর্ণনা যেমন ভয়ঙ্কর, পথের দুর্ভোগ ও দালালদের অত্যাচার নির্যাতনও তেমনি হৃদয়বিদারক। দালালদের অত্যাচারে সঙ্গীদের জীবন হারানোর কথাও উঠে আসে তাদের বয়ানে।

শুরুটা হয় ফোনে
ওমান থেকে তুরস্কে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিক রাকিব তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এভাবে:  কুমিল্লার মুরাদ নগরের বাইয়া গ্রামের শাহেনুর আমার দূর সম্পর্কের চাচা। গ্রিসে থাকেন। কিছুদিন পরপরই বাড়িতে লাখ লাখ টাকা পাঠান। ওমানে বৈধ শ্রমিক হয়েও রোজগার বলতে আমার তেমন কিছুই ছিল না। ওমান থেকেই চাচাকে ফোন করি। তিনি জানান, গ্রীসে খুব ভাল আছেন। অল্প দিনে তাকে বৈধ করে নিয়েছে দেশটির সরকার। আগামী একমাসের মধ্যে যত অবৈধ অভিবাসী আছে সবাইকে বৈধ করে নেওয়া হবে। এসব শুনে আমিও সেখানে যাওয়ার আগ্রহের কথা জানাই। তিনি বেশ খুশি হয়েই আমাকে ওমানের এক দালালের নম্বর দেন। দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ১৫ দিনের মধ্যে গ্রিসে পৌঁছাতে পারব বলেও আশ্বাস দেন তিনি। তবে শুরুতে দালালকে এক লাখ টাকা দিয়ে বাকিটা গ্রিসে গিয়ে আয় করে পরিশোধ করলেও চলবে বলেন চাচা।’
রাকিব নিজে থেকে ফোন করলেও বেশির ভাগ শ্রমিকের কাছে ‘ভাল থাকার’ খবর জানিয়ে ফোন করেন তাদেরই পরিচিত ইউরোপ-প্রবাসীরা। ভিওআইপি নম্বর ব্যবহারের কারণে আসলে কোনো দেশ থেকে ফোন আসছে সেটাও ওই মুহূর্তে বোঝা যায় না। তবে সহজ সরল অল্প শিক্ষিত  শ্রমিকরা কাউকে অবিশ্বাস করেন না। তারা সহজেই মিষ্টি কথায় মজে যান।

মনিরুল আলম নামের আরেক শ্রমিক বলেন, ‘অবিশ্বাস করার সুযোগই থাকে না। কথা বলার সময় অনেকবার আল্লাহর নাম ব্যবহার করে। নিয়মিত নামাজ পড়ার পরামর্শও দেয়। তাদের বেশি আয় করার কথা শুনে আমরাও স্বপ্ন দেখি।’

প্রথম দালালের খপ্পড়ে পাসপোর্ট-অর্থ হারানো
জানা যায়, ফোনে যিনি যোগাযোগ করিয়ে দেন পুরো প্রক্রিয়াতে তাকে আর পাওয়া যায় না। তার দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে অন্য দালালের কাছে যেতে হয়। সংশ্লিষ্ট শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের যেদেশে কাজ করেন সেদেশের পাট চুকিয়ে, শেষ সম্বল খুইয়ে কেবল ইউরোপ যাওয়া স্বপ্ন বুকে নিয়ে হাজির হয় দালালদের কাছে। তারা এসব শ্রমিকদের একটি ঘরে নিয়ে সবার পাসপোর্ট  অর্থ কেড়ে নেয়। অসহায় শ্রমিকরা তখন পুরোপুরি এসব দালালের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এভাবে একটি দলে ১০-১৫ শ্রমিক জোগাড় হলেই তাদেরকে ‘গেম’-এর জন্য প্রস্তুত হতে বলা হয়। এসব দালাল শুরুতে ভাল ব্যবহারকরে। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে ওদের চেহারা পাল্টে যেতে থাকে। সময় যতো যেতে থাকে ততই এদের নির্মমতা প্রকাশ পেতে থাকে।

স্পিড বোটে আরব সাগর পাড়ি
ভুক্তভোগী বহু বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দালালদের খপ্পড়ে পড়ার পর এই শ্রমিক দালালের ঘর থেকে আর বেরুতে পারে না। এক বেলা, আধা বেলা করে খেয়ে সেখানে কাটে কয়েকটি দিন। এরপর তাদেরকে রাতের অন্ধকারে ওমানের সীমান্তে নিয়ে সেখানকার জঙ্গলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন অপেক্ষা করানো হয়। কারণ, সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ‘গেম’ শুরুর জন্য অনুকূল সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সবকিছু অনুকূল হলেই ‘শুরু হয় ‘গেম’ বা অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার পর্ব।

এ বর্ণনাও শোনা যাক রাকিবেরই জবানিতে:
ওমানের আল-খুদ নামক জঙ্গলে রাতের পর রাত না খেয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাদের। স্পিড বোট না আসায় সকালে ফিরে গেছি দালালের ডেরায়। পরের রাতে আবারও অপেক্ষা। এভাবে প্রায় আট রাত অপেক্ষার পর ‘গেম’-এর জন্য সিগন্যাল ক্লিয়ার হয়।

আরব সাগরের তীরেই আসে স্পিড বোট। তবে একেবারে তীরে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ। সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়ার আশংকা থেকেই যায়। তাই সাগরে গিয়ে শ্রমিকদের কখনও কোমর পানি কখনও বা গলা সমান পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। স্পিডবোট এলে মাত্র মিনিট খানেক সময় মেলে। এর মধ্যেই সকলকে এক রকম লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠতে হয় বোটে। কেউ যদি উঠতে না পারে, তাকে সেখানেই পড়ে থাকতে হয়। এভাবে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে, সাগরের নোনা পানি খেয়ে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্পিডবোটে এরকম কেউ আছে দালালরা সেটা বুঝতে পারলেই আর রক্ষা নেই। সঙ্গীদের চোখের সামনে তাকে সাগরেই ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়।

আরেক বাংলাদেশির নাম আলতাফ। তিনি বর্ণনা করেন তার অভিজ্ঞতা:
“চারদিকে আরব সাগরের পানি। কিন্তু এক ফোঁটা খাওয়ার পানি নেই কোথাও। আমাদের স্পিডবোটে একজন পানির জন্য কাতরাচ্ছিল। শরীরও দুর্বল হয়ে পড়েছিল তার। মারা যেতে পারে এমন আশঙ্কায় দালালরা সবার চোখের সামনে তাকে সাগরে  ছুঁড়ে ফেলে দেয়। অথচ নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেই তারা টাকা নিয়েছিল।’
এক স্পিড বোটে একাধিক দালালের হাতে জিম্মি শ্রমিকদের আনা হয়। বাংলাদেশি ছাড়াও ইরানি, পাকিস্তানি এবং ওমানি দালালদের হাতে জিম্মি হওয়া শ্রমিক যেমন ছিল, তেমনি  দালালদের নিজেদের দেশের দেশের শ্রমিকও ছিল বলে জানান আলতাফ। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আরব সাগরের ওপর জিম্মি শ্রমিকদের নিয়ে ছুটে চলে স্পিড বোট। এরপর এক সময়  হরমুজ প্রণালি পার হয়ে ইরানের জল সীমায় প্রবেশ করে স্পিডবোট। সেখান থেকে ডাঙায় নেমে তাদেরকে পৌঁছে দেওয়া হয় সাগরতীরবর্তী জঙ্গলে।

অর্থ আদায়ের চোরা কুঠি
ইরানের জঙ্গলই পাচারকারীদের জন্য অর্থ আদায়ের চোরাকুঠি হয়ে উঠেছে। এখানে আনার পর শ্রমিকদের ওপরে অত্যাচার চরমে পৌঁছে। সেখানে একেক দালালের একেকটি কেম (ক্যাম্প) বা ঝুপড়ি ঘর আছে। এই কেমে নিয়ে শ্রমিকদের কাছে তাদের পরিবারের লোকদের মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়। তারপর ওইসব নম্বরে ফোন করে দালালরা বিরাট অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে। এ সময় শ্রমিকদের ওপর চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। আর শ্রমিকদের ভয়ার্ত আর্তনাদ শোনানো হয় তাদের স্বজনদের।পরিবারের প্রিয় মানুষটির প্রাণ বাঁচানোর জন্য দিশেহারা স্বজনরা তখন সব সম্বল বিক্রি করে হলেও মুক্তিপণ দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতে দেরি করলে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়।  অনাহারে অর্ধাহারে থেকে, নানা অখ্যাদ্য খেয়ে, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হতে কেউ কেউ মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়ে।আর যারা সহজে টাকা দিয়ে দেয় তাদের উপর ‘আরও’ টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে দালালরা।

দালালের হাতে জিম্মি হয়ে দু:স্বপ্নময় অভিজ্ঞতা নিয়ে ইস্তাম্বুলে পৌঁছা আরেক বাংলাদেশির নাম আব্দুল হামিদ। হবিগঞ্জের বাসিন্দা হামিদের নিজের জবানিতে শোনা যাক তার অভিজ্ঞতা:

ইরানের জঙ্গলে পৌঁছার পর সেখানে থাকা বাংলাদেশি দালালরা আমার পরিবারের কাছে নয় লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় আমার উপর শুরু হয় অমানষিক অত্যাচার। আমাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করার জন্য তাদের আলাদা লোক আছে। স্ত্রীকে বলেছিলাম আমার মায়া ছেড়ে দিতে। কিন্তু সে ফসলের জমিজিরেত বিক্রি করে আমাকে উদ্ধার করে।”

আব্দুল হামিদ তার শরীরে দালালের নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন দেখান এ প্রতিবেদককে।

হেঁটে পাড়ি দিতে হয় মরুভূমি, পাহাড় আর বরফঢাকা পথ
ইরানের দালালরা মুক্তিপণ পাওয়ার পর জিম্মি বাংলাদেশি শ্রমিকদের তুরস্কের উদ্দেশ্যে পাঠায়। মূলত তুরস্কের দালালদের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্তই তাদের দায়িত্ব। তবে ইরান থেকে তুরস্কে  ঢুকতে হলে পাড়ি দিতে হয় মাইলের পর মাইল মরুভূমি, পাহাড় এমনকি বরফে ঢাকা পথও। না খেয়ে, এক কাপড়ে টানা কয়েকদিন ধরে হেঁটেই সেসব পথ নিয়ে যায় দালালরা। শ্রমিকরা হেঁটে এগুলেও দালালরা চলে কখনো গাড়ি চড়ে, কখনো ঘোড়ায় বা খচ্চরের পিঠে চড়ে।

আব্দুল আজিজ আরেক বাংলাদেশি শ্রমিক যাত্রাপথের দু:সহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন:
খাবার দূরে থাক, প্রচন্ড পানির পিপাসায়ও একফোঁটা পানি মেলেনি। রাত কেটেছে মরুভূমিতে, পাহাড়ের গুহায়। আমি একটি হাফ প্যান্ট পরে বরফের মধ্য দিয়ে হেঁটে তুরস্ক পৌঁছাই। তুরস্ক- ইরান সীমান্তে সীমান্তরক্ষীদের হাতে পড়ার ভয় খুব বেশি না থাকলেও মুরভূমি আর বরফের কারণে অনেকেরই যাত্রা সেখানেই শেষ হয়।”

যাত্রাপথে একাধিক মানুষের লাশ দেখেছেন জানিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি:
সে দৃশ্য না কতটা অমানবিক না দেখলে কাউকে বিশ্বাস করানো কঠিন। শুধু ভাল আয়ের আশায় বেরিয়ে কুকুরের মত রাস্তায় লাশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি মানুষগুলোকে। আমার আত্মীয় নয়, তবুও তাদের জন্য বুক ফেটে কান্না আসে আমার। আমি সেসব দিনের কথা আর মনে রাখতে চাই না।”

তুরস্কের সেফ হোম নামের আরেক বিভীষিকা
অবর্ণনীয় সব যন্ত্রণা সহ্য করে যারা টিকে থাকেন, তারাই পৌঁছান তুরস্কে। তবে ছাড়ার আগে তুরস্কে অবস্থানকারী দালালরা আরেক দফা জিম্মি করে অসহায় দরিদ্র বাংলাদেশি শ্রমিকদের। যারা একদিন ফোন করে ইউরোপ নিয়ে যাবে বলে লোভ দেখিয়েছিল তাদেরকেই পাওয়া যায় তুরস্কে। মূলত এরা তুরস্ক থেকে ফোন করে গ্রিস বা ইতালিতে থাকে বলে জানিয়েছিল। এবার তারাই শ্রমিকদের ‘সেফ হোম’ রেখে একইভাবে বাড়িতে ফোন করে দাবি করে মুক্তিপণ। তুরস্ক সীমান্ত এলাকায় এমন বহু বাড়ি আছে, দালালরা যেগুলোকে ‘সেফ হোম’ বলে। তুরস্কে এসে তাদের প্রিয়জন আবারও জিম্মি হয়েছে –এমন খবর স্বজনদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এমন খবরে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বজনেরা। কিন্তু প্রিয় মানুষের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তাদেরকে আবারও বাধ্য করে টাকা দিতে। এরপরেই মেলে চূড়ান্ত মুক্তি। হতভাগ্য এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো উপায়ে দুর্ভোগ-দু:স্বপ্ন পেরিয়ে পৌঁছায় তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে। ইউরোপ আর এশিয়ার সংযোগস্থল এই শহরে কাজ খুঁজে নিয়ে সবকিছু নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করে তারা। সে চেষ্টা তাদের ভুলিয়ে দেয় দালালদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার তাগিদ। কেননা ততদিনে নিঃস্ব হওয়া পরিবারকে আবার স্বচ্ছল করে তোলার চেষ্টায় ব্যকুল হয়ে ওঠে এসব জীবনযোদ্ধা।

হবিগঞ্জের আব্দুল হামিদকে তুরস্ক সেফ হোমে দ্বিতীয়বার জিম্মি করা হলে তার স্ত্রী তাকে মুক্ত করতে ভিটে বাড়িটুকুও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। হামিদ বলেন, ‘আমাকে ছাড়াতে গিয়ে মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়েছে আমার পরিবার। দুই সন্তান নিয়ে আমার স্ত্রী এখন বাপের বাড়িতে থাকে।’

পরিচিতদের ফোন করতে বাধ্য করা হয়
সেফ হোম থেকে এসব শ্রমিকদের মুক্তি দেওয়ার আগে আরেকটি খেলা খেলে দালালরা। শ্রমিকরা যে দেশে ছিল সেখানে তাদের সতীর্থ শ্রমিকবন্ধুদেরও ইউরোপের আসার একই টোপ দিয়ে ফোন করতে বলা হয়। তাদের কথায় বিশ্বাস করে সহকর্মী শ্রমিকদের কেউ রওনা হলেই কেবল মুক্তি মেলে জিম্মি হওয়া শ্রমিকের। এভাবেই দালালরা তাদের হাতে জিম্মি হওয়া শ্রমিকদের ব্যবহার করে জিম্মি করে যাচ্ছে আরো অনেক অসহায় শ্রমিককে। বাংলাদেশি হয়েও আরেক বাংলাদেশিকে জিম্মি করে দিনের পর দিন অর্থ আদায়ের এই নিষ্ঠুর অমানবিক খেলা চলছে অবাধে। অর্থের বিনিময়ে তারা সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকদের কাজে লাগাচ্ছে, করে নিচ্ছে নিজেদের দুষ্কর্মের দোসর।

শুরুর দিকে যে শ্রমিকের অভিজ্ঞতা জানিয়েছিলাম সেই রাকিব বলেন, “আমি জানতাম শাহেনুর চাচা গ্রিসে থাকে। কিন্তু তুরস্কে আসার পর দেখি তিনি গ্রিসে নয়, তুরস্কে থাকেন। তিনিই আমাকে জিম্মি করেন। আবারও টাকা নেন আমার বাড়ি থেকে। তার সেফ হোমে অনেকদিন কাটিয়েছি। ওমানে আমার পরিচিত কয়েকজনকে ফোন করে আমাকে বলতে হয়েছে, অল্প টাকায় মাত্র কিছু দিনে নিরাপদে আমি গ্রিসে এসেছি। খুব ভাল আয়ও করছি। তোমরাও একই পথে চলে এসো। দেখবে রাতারাতি ভাগ্য খুলে যাবে। এরপরেই আমি ছাড়া পাই।”

জানা যায়, একইভাবে শুধু ওমান নয়, ইউরোপে যাওয়ার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন বা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ থেকেই শ্রমিকরা এভাবে দালালের সাহায্য নিতে গিয়ে তাদের খপ্পড়ে পড়েন। জিম্মি হয়ে সবাই তাদের শেষ সম্বলটুকু হারান।  কেউ বা হারান জীবনটাই।

শ্রমিকদের এই দুর্ভাগ্যের বিষয়ে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী  বলেন, শুধু  একটি ফোনকলের উপর নির্ভর করে এসব শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অথচ তারা যদি একটু জানার চেষ্টা করতো ইউরোপ যাওয়া আসলেই সম্ভব কিনা, বা ফোনকলটি কোন দেশ থেকে এসেছে তাহলেই তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। সচেতনতার অভাবে তারা দালালচক্রের ফাঁদে পা দেয়। তবে এসব অপতৎপরতা ঠেকাতে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার কাজ করছে। এরই মধ্যে অবৈধভাবে শ্রমিক আসা অনেকটাই কমে এসেছে।