বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কি জামায়াতকে ছেড়েই রাজনীতিতে নতুন করে মধ্যপন্থি নীতি নিয়ে হাঁটবেন? রাজনীতির অন্দরমহলে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ঘরে-বাইরের চাপের মধ্যে জামায়াতকে ছাড়ার কথা ভাবছেন বলে নানা সূত্র জানিয়েছে। রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি এখন দুই দুইবার ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়া। তার দল বিএনপিও অতীতে এমন বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপি নেতৃত্ব এতদিন পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও হাইকমান্ডের এখন মোহভঙ্গ হতে শুরু করেছে।

২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতকে নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসা বিএনপি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত দলটি তাদের জন্য বোঝাই নয়, রীতিমতো অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সূত্র জানায়, জামায়াতের সহিংস রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগের বোঝা বহন করা আর উচিত কিনা তা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিমধ্যে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক চাপ ও দেশের মানুষের মনোভাব বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতকে ছাড়াও নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ই জামায়াতকে ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও জামায়াতের ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত বিএনপি জামায়াত শাসনামলের জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটি হিসেবে বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করতে দেয়ায় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আগেই শঙ্কিত ছিল। ওয়ান ইলেভেনের বিপর্যয় থেকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ট্রাম্পকার্ড নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেও বিএনপি জামায়াতকে ছাড়েনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে সংঘটিত সহিংস হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি বিএনপি জামায়াতকে এক পাল্লায় তুলে দিলেও সে আন্দোলন ভোট রুখতে পারেনি। সংবিধানের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ দ্রুতই পশ্চিমাদের চাপে নির্বাচন দেবে বাধ্য হবে মনে করে বিএনপির যে নেতৃত্ব তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিলেন তাদের মোহ ভঙ্গ হয়েছে। পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সরকার কূটনৈতিক সম্পর্ক টানাপড়েনের ভেতর থেকে বেরিয়ে উষ্ণ করে ফেলেছে। সর্বশেষ বিএনপির তিন মাসের টানা অবরোধ-হরতালে জামায়াতকে তো পাশে পায়ইনি উল্টো নিজেদের নেতাকর্মীরা মামলার জালে আটকা পড়ে হয় কারাবন্দি না হয় ফেরারি হয়েছে। বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীরাও মনে করেন জামায়াতকে ছেড়ে ডান নয়, বাম নয়, মধ্যপন্থি সোজা পথ নিয়েই বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতির রণকৌশল নতুন করে সাজাতে হবে।
বিগত আন্দোলনের অর্জন শূন্যের কোঠায় নয়, পেট্রলবোমার সহিংস রাজনীতি আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বিএনপিকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির কাঠগড়ায় সরকার দাঁড় করাতে পেরেছে। শক্তিক্ষয়ের মধ্য দিয়ে তিন সিটির নির্বাচনে বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে এলেও ফলাফল তুলতে পারেনি। তিন সিটি নির্বাচনেও জামায়াতকে পাশে পায়নি বিএনপি। এমন অভিযোগ দলের হাইকমান্ডের কাছে রয়েছে। নাইন ইলেভেনের টুইন টাওয়ারের হামলার পর থেকে বিশ্বায়নের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে রাজনীতি বিশ্বকে একসুতোয় বেঁধেছে সেখানে বিএনপি সংযোগ রাখতে পারেনি। এইখানে আওয়ামী লীগ সরকার যুৎসইভাবে নিজেদের একাত্ম করেছে। জঙ্গিবাদবিরোধী রাজনীতিতে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেখানে সাম্প্রদায়িক জামায়াতসহ দক্ষিণপন্থিদের নিয়ে জোট বেঁধে পথ হাঁটছেন সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে অতিশয় দুর্বল হলেও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে পাশে রেখেছেন। ক্ষমতায় ও রাজনীতিতে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন এখানেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার পায়ের নিচে মাটি যেখানে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেখানে শক্ত।
পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, লন্ডনে বসে দেশের বাস্তবতা সম্পর্কে যাদের ধারণা তিরোহিত তাদের প্রেসক্রিপশনে কর্মসূচি ও পদক্ষেপগুলো ছিল বিএনপি ও তার নেত্রীর জন্য আত্মঘাতী। খালেদা জিয়াকে তার ৪০ বছরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। নির্বাসিত পুত্রদের একজনকে হারাতে হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়া মানসিক চাপের মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসা বিপর্যয় ছাড়াও নিজের এবং তারেক রহমানের মামলা নিয়েও উদ্বিগ্ন। দণ্ডিত হলেই আগামী নির্বাচনে তিনি অযোগ্য হবেন। সেখানে তাকে ও তারেক রহমানকে বাইরে রেখে বিএনপির একটি অংশ আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এমন গুঞ্জন দীর্ঘদিন থেকে রয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে বেগম খালেদা জিয়া যে ভুলটি করেছিলেন তার মাশুল দিচ্ছে বিএনপি। বিএনপিতে শীর্ষ নেতারা মনে করেন দলে এখনও খালেদার বিকল্প খালেদাই। এই সময়ে জামায়াতকে ছেড়ে দলের কারাবন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলার জাল থেকে নেতাকর্মীদের বের করা এবং ধৈর্যের সঙ্গে  নতুন করে সঠিক রণকৌশল নির্ধারণই বড় চ্যালেঞ্জ। খালেদা জিয়ার সামনে এদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগই বড় মডেল।
‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে পরিবার-পরিজনসহ হত্যার পর জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে খুন করা হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জেল ও ফেরারি জীবনে যেতে হয়েছিল। দলে এসেছিল ভাঙন। চারদিকে ছিল অপপ্রচার। অতি বাম অতি ডান ও উগ্রপন্থিরা সামরিক শাসকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগকে অক্টোপাসের মতো ধরে ছিল। সেখান থেকে প্রতিটি নির্বাচনে পরাজয় জেনেও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছে। ‘৮১ সালের কাউন্সিলে নির্বাচিত দলের সভানেত্রী নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরে দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে একুশ বছর পর দলকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। হঠকারী পথ আওয়ামী লীগ নেয়নি। সহজপথে দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা করেনি।
বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার দলের জনসর্মথন এখনো ব্যাপক। এক্ষেত্রে সংগঠন গোছানো বিএনপি নেত্রীর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবস্থান পরিষ্কার করে পশ্চিমা ও গণতান্ত্রিক দুনিয়ার সঙ্গে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে আপসহীন পথে হেঁটে ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলন বা নির্বাচনের লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হবে। বিএনপির অধিকাংশ নেতাই এখন সেটি মনে করেন। সবার দৃষ্টি এখন খালেদা জিয়ার দিকে। কোন পথ তিনি নেন।