গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে জয়দেবপুর সিজিএস পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার গ্যাস লাইন বসানোর জন্য জমি হুকুম দখলের সময় ‘ক্ষতিপূরণ’ বাবদ সরকারের কোটি কোটি টাকা লুণ্ঠনের জন্য মতলববাজরা রাতারাতি শত শত ঘর তুলছে। যেন মাটি ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে থাকে এসব ঘর। বিষয়টি এলাকায় বিষ্ময়, কৌতূহল ও রসিকতার সৃষ্টি করেছে। লোকজন বলছে, এমনিতে তীব্র দুশমনি চললেও গ্যাস লাইনের টাকা লোপাটের চক্রান্তের মাঠে ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপি ভাই ভাই ঠঁাঁই ঠাঁই’ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আক্তারুজ্জামান মাস্টার। স্থানীয়দের ভাষায়, তিনি গ্যাস লাইনের ধান্ধাবাজ। দেশের যেখানেই গ্যাস লাইন বসে সেখানেই তিনি রাতারাতি তোলেন শত শত ঘরবাড়ি। বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজ উদ্দিনও একই কাজে পারদর্শী। তারা দুজন এবার গাজীপুরে পাইপ লাইনের পথে রাতারাতি গড়ে তুলেছেন শত শত ঘরবাড়ি।শুধু আক্তারুজ্জামান মাস্টার ও হাফিজ উদ্দিনই নন, কৃষকদের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় প্রভাবশালী অন্তত ৪০ জন নেতা রাতারাতি ঘর তুলেছেন।আক্তারুজ্জামান দাবি করেন, তিনি ঘর তোলেননি। তার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে।হাফিজ উদ্দিনও একই দাবি করেন। কিন্তু তাদের গ্রামের মানুষজনই জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এভাবে ঘর-বাড়ি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারা। একটি সূত্র জানায়, ওই টাকায় হাফিজ উদ্দিন ৪০০ বিঘা জমি কিনেছেন। সূত্র জানায়, গাজীপুরে দৈনিক ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সংকট রয়েছে। সংকট মোচনে সরকার ৩০ কিলোমিটার গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য ১১ দশমিক ৫৬০০ একর জমি হুকুম দখলের প্রক্রিয়া চলছে। শ্রীপুর ছাড়াও গাজীপুর সদর উপজেলার পাজুলিয়া, ভানুয়া, ফাকাইল, চাপুলিয়া, ভুরুলিয়া ও জয়দেবপুর মৌজায় জমি অধিগ্রহণ করা হবে। গাজীপুর ইউনিয়নের ধনুয়া থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার নতুন গ্যাসের পাইপ লাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হবে। সূত্র জানায়, দুষ্টুচক্রের লোকেরা প্রস্তাবিত গ্যাস পাইপ লাইনের নকশার নকল সংগ্রহ করে প্রকল্প এলাকায় কৃষকদের কাছ থেকে ফসলি জমি ভাড়া নেয়। পরে রাতারাতি ঘর তুলতে থাকে। গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের ৮২ কিলোমিটার নতুন গ্যাস পাইপ লাইন বসানোর সুযোগে লুণ্ঠনের জন্য যে চক্র গড়ে উঠেছে তাতেও দেখা যায়, আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতারা কাঁধে কাঁধ রেখে ‘কর্মব্যস্ত’ রয়েছেন। বরমী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাজ্জাক বেপারী বলেন, সরকারি টাকা হাতিয়ে নিতে এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি এক হয়েছে। অথচ রাজপথে তারাই লাঠি নিয়ে একে অপরের মাথা ফাটায়। তিনি বলেন, পাইপ লাইনটির জন্য কোন এলাকার জমি অধিগ্রহণ করতে হবে তার রোডম্যাপ কীভাবে মানুষ জানল? অবশ্যই এর সঙ্গে তিতাস গ্যাস ও স্থানীয় প্রশাসনেরও কেউ জড়িত। রোডম্যাপটি এখন পরিবর্তন দরকার। তা করা হলে সরকারের যে টাকা বাঁচবে তা দিয়ে বরমীর মতো অন্তত ১০টি ইউনিয়নে গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মো. নুরুন্নবী আকন্দ বলেন, ডিসি অফিস ও তিতাসের লোকজন ছাড়া গ্যাস পাইপ লাইনে স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাদের সম্পৃক্ততা আছে বলেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে পারছে। গাজীপুর আর টাঙ্গাইলে মোট ৮২ কিলোমিটার গ্যাস লাইন বসবে। এই ৮২ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যেসব এলাকা দিয়ে নতুন গ্যাস লাইন যাবে, সেখানে সারিবদ্ধভাবে হাজার হাজার ঘর তোলা হয়েছে। বহিরাগত কিছু লোকও শিকারি হিসেবে এসেছে। তারা কাজ করছে স্থানীয়দের ছত্রছায়ায়। তারা চুক্তিতে জমি ভাড়া নিয়ে অতি নিুমানের ইট ও টিন দিয়ে এসব ঘর তুলেছে। যেসব ঘর তোলা হয়েছে সেগুলোর উচ্চতা চার থেকে পাঁচ ফুট, প্রস্থ আট থেকে ১০ ফুট। কিন্তু ঘরই চলে গেছে টানা ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট পর্যন্ত। দীর্ঘ এসব ঘরে প্রবেশের দরজা খুঁজে পাওয়াই কঠিন। ধনুয়া এলেঙ্গার পাইপ লাইনটি যে পথে যাবে, তার একটি গাজীপুর ইউনিয়ন। এখানে ধানক্ষেতে এখনো প্রতিদিন নতুন ছাপড়া ঘর তৈরি হচ্ছে। এই ধানক্ষেত থেকে যে আয় হতে পারত তার চেয়ে বেশি টাকা পেয়ে জমি অন্যের কাছে ভাড়া দিয়েছেন বলে স্বীকার করলেন এলাকার ষাটোর্ধ্ব ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, সাড়ে তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করলে কী পেতাম। এখান থেকে ভাড়া পেলাম তিন লাখ ট
াকা। ঘর তোলায় যারা পারদর্শী তাদের মধ্যে রয়েছেন শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিরুল ইসলাম জিকু। এ ছাড়াও শ্রীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম, শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোসলেহ উদ্দিন মৃধা, মাওনার লিয়াকত সরকার, টেংরা স্কুলের সহকারী শিক্ষক জামাল মাস্টার, বিএনপি নেতা আজাদ, নিমাইচালা ভিটিবাড়ির হাফিজ বেপারী, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম সাজিদ, শ্রীপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রভাষক খন্দকার মাহমুদুল হাসানসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আরও ডজনখানেক নেতা। তেলিহাটি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আক্তারুজ্জামান মাস্টার জানান, গ্যাস ডিপার্টমেন্টের লোকজনই এসব করছে। শুধু শুধু আমার নাম জড়ানো হচ্ছে। আমি এর কিছুই জানি না। আমি একজন শিক্ষক। শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিরুল ইসলাম জিকু ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলে জানান। মাহমুদুল হাসান বলেন, তিনি কিছু জমি ভাড়া নিয়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকা খরচ করে কিছু ঘর তুলেছিলেন। কিন্তু মার খেয়েছেন। তাই ওসব ছেড়ে দিয়েছেন। শামীম সাজিদ বলেন, তিনি নিজের জমিতে চার লাখ টাকা খরচ করে কিছু ঘর তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি ক্ষতিপূরণ পাই, তাহলে কোটি টাকা পেয়েও যেতে পারি।’ গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলাম , জমিগুলোর ভিডিওচিত্র ধারণ করা আছে। এখন ওইসব জমিতে ব্যাঙের ছাতার মতো ঘর উঠলে ক্ষতিপূরণ পাবে এমন ধারণা ঠিক নয়। চক্রান্তকারীদের বাসনা পূরণ সরকারের কাজ নয়। প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুস সাত্তার বলেন, পাইপ লাইনের  রোডম্যাপ পরিবর্তন এখনো সম্ভব।