খুবই অগোছালো অবস্থা বিএনপির। দলটি স্বাভাবিক কর্মসূচি পালন করতেও হিমশিম খাচ্ছে। অধিকাংশ নেতাকর্মী কারাগার অথবা আত্মগোপনে। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৩৪তম শাহাদাত বার্ষিকীর আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করা হলো বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠা মহাসচিব। বিএনপি সরকার গঠন করলে কিছুদিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার পর তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার বড় ছেলে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দিয়েছেন, তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিকল্পধারা নামে একটি নতুন দলও করেছেন তিনি। আর সেই থেকে বি চৌধুরীর প্রতি বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তা এখনো সতেজ আছে তা বুঝা গেল ওই আলোচনায় সভার আয়োজনে।

‘খালেদা জিয়া ও তার ছেলে দেশটাকে শেষ করে দিয়েছে। চুরি করেছে আড়াই লাখ কোটি টাকা।’ বি. চৌধুরী, জনকণ্ঠ ৭ নভেম্বর ২০০৬।

‘একজন অমানুষ দেশ চালাচ্ছেন। সংলাপ ব্যর্থ হলে তিনিই দায়ী থাকবেন অসাংবিধানিক পন্থায় ইচ্ছামতো রাষ্ট্র চালাচ্ছেন সেই দুষ্টু লোক প্রধানমন্ত্রী।’ বি চৌধুরী, জনকণ্ঠ, ১১অক্টোবর ২০০৬।

‘বেগম খালেদা জিয়া হচ্ছে চোর আর সন্ত্রাসীদের নেত্রী। গত ৫ বছর জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে বিএনপির এই নেত্রী খালেদা জিয়া তার পরিবার ও তাদের কিছু চামচা। এজন্য বিএনপি এখন দেশবাসীর কাছে ঘৃণার দলে পরিণত হয়েছে।’ -বি চৌধুরী, ইনকিলাব, ৮ ডিসেম্বর ২০০৬।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে বি চৌধুরীর বক্তব্যের কিছু নমুনা এগুলো। দীর্ঘদিন পর এই সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেল। যার প্রমাণ পাওয়া গেল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির অনুষ্ঠানে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দর্শক সারিতে। যদিও বরাবরই এ ধরনের অনুষ্ঠানে তার এই রীতিই দেখা যায়। তবে নতুন আকর্ষণ ছিলেন বি. চৌধুরী। তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন।

অন্য বছরগুলোতে এমন অনুষ্ঠানে সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও এবার তার ব্যতিক্রম হয়েছে। অনুষ্ঠানে ছিলেন না কারাগার বা আত্মগোপনে না থাকা নীতি নির্ধারণী ফোরামের অধিকাংশ সদস্য।

বিএনপির একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, বি. চৌধুরীকে প্রধান অতিথি করায় অনুষ্ঠানে অনেক নেতাকর্মী যায়নি। অনুষ্ঠান চলকালে বিএনপির মধ্যম সারির এক নেতা এ প্রতিবেদককে মোবাইল ফোনে অনুষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা জানতে চান। প্রধান অতিথির নাম শুনতেই তিনি অনুষ্ঠানে যাবেন না বলে জানান।

জিয়াউর রহমানের ৩৪তম শাহাদাত বার্ষিকীর আলোসভায় উপস্থিত ছিলেন না কেন জানতে চাইলে বিএনপির অন্যতম পরামর্শক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ জানান, তিনি এবং তার স্ত্রী খুবই অসুস্থ। এ প্রতিবেদকের কাছ থেকে তিনি আলোচনা সভা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আইনজীবী খন্দকার মাহাবুব হোসেনও  কাছে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার কারণ হিসেবে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন। তিনিও আলোচনার খোঁজখবর নিয়েছেন।

তবে বি. চৌধুরীকে পেয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে সন্তোষও দেখা গেছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ আলোচনা সভায় বি. চৌধুরীর উপস্থিতিতে খুশি হয়েছেন বলেছেন।

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. আসাদুজ্জামান রিপন তার বক্তব্যে বলেছেন, বি. চৌধুরীকে সম্মানিত করা হয়েছে।

বি. চৌধুরী অবশ্য জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনায় এসে স্বভাবসুলভ বক্তব্যই দিয়েছেন। জাতীয়তাবাদী শক্তির পুনরুত্থানের জন্য বিএনপি নেত্রীসহ নেতাকর্মীদেরকে ভুল শোধরানোর কথা বলেছেন। জিয়াউর রহমানের আদর্শের কথা বলেছেন। নিজের দলকে ছোট দল মন্তব্য করে বলেছেন, তার দল সন্ত্রাসের বিপক্ষে।

বিএনপির অনুষ্ঠানে বি. চৌধুরীর উপস্থিতি যেখানে খালেদা জিয়াও ছিলেন- এটা বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হলো- বি. চৌধুরী কি তাহলে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে অভিযুক্ত করে এর আগে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রত্যাহার করেছেন, নাকি খালেদা জিয়া বি. চৌধুরীর অভিযোগ সমর্থন করলেন? নাকি অস্তিত্ব সঙ্কটের কালে শুধু রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রচেষ্টা।