কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ

0
314

‘নির্বাচনী মিশন’-এ নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় দু’বছর বাকি থাকলেও দলটি শুরু করেছে ব্যাপক গণসংযোগ। চলছে নেতাদের সাংগঠনিক সফর। পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে শুরু হয়েছে নানা তৎপরতা। নেতারা শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই নয়, অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও। নিজ নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও জেলা-উপজেলায় নিয়মিত উপস্থিতি বেড়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের। এসব অনুষ্ঠানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন তারা। এর মাধ্যমে কার্যত আগামী নির্বাচনের মাঠ গুছিয়ে আনছে ক্ষমতাসীনরা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা নির্বাচন’-এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসে। এতে দেশের ভেতর-বাইরে দলটি বেশ সমালোচিতও হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, বহির্বিশ্বের সঙ্গেও আশানুরূপ সম্পর্ক উন্নয়ন করতে সমর্থ হয়েছে বর্তমান সরকার। এরপরও যাতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কোনো নেতিবাচক প্রভাব আগামী নির্বাচনে না পড়ে, তা সামনে রেখেই আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীনরা।

পাশাপাশি আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে ‘আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ অনুযায়ী ক্ষমতাসীন হওয়ায় আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ফল যেতে পারে বলেও আশংকা কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের। এ বিষয়টিও আগাম প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিবেচনায় রয়েছে দলটির। অর্থাৎ নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে রাখতে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ। যে কারণে জনসমর্থন আদায়ে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখবে দলটি।

গত ১৪ জানুয়ারি দলের একটি সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন বছর পূর্ণ করে চার বছরে পা দিয়েছি। টানা আট বছর। কাজেই এখনকার পথ হবে আরও কঠিন। এখন থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে।’ নির্বাচনে দলের ইশতেহারের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর আগে দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলনেও শেখ হাসিনা সব নেতাকর্মীকে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের গৃহীত ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তিনি জনগণের সামনে তুলে ধরার নির্দেশ দেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম যুগান্তরকে বলেন, তারা নির্বাচনকে সামনে রেখেই গণসংযোগ বাড়িয়েছেন। বিভিন্ন এলাকা সফর করছেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো নিজেরা তদারকি করছেন। এসবের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কাজটিও হচ্ছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে আমরা নিজেদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করছি।

দলীয় সূত্র জানায়, চলতি জানুয়ারি থেকে আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মকাণ্ড নির্বাচনমুখী। শুরু হয়েছে সাংগঠনিক সফর। ৮টি বিভাগীয় টিমে ভাগ হয়ে জেলা-উপজেলায় যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। যেখানেই যাচ্ছেন, সমাবেশ, জনসভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনের পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তারা। তুলে ধরছেন দেশের উন্নয়ন এবং সরকারের অর্জনগুলো। যদিও এ প্রবণতা শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। ডিসেম্বরে হযরত শাহজালাল (রা.) মাজার জিয়ারত করে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী সফর শুরু করার কথা থাকলেও তখন জেলা পরিষদ নির্বাচন থাকায় শুধু সরকারি কর্মসূচিতেই সফর সীমাবদ্ধ রাখেন শেখ হাসিনা। কিন্তু জানুয়ারি থেকেই তার অভ্যন্তরীণ সফরে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।

তিনি গত ২৬ জানুয়ারি গোপালগঞ্জ সফরে যান। সেখানে সরকারি কর্মসূচি শেষে তিনি গোপালগঞ্জ শহরে তার পৈতৃক বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বসেন প্রথমবার। সেখানে নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। ঢাকায় ফিরে একদিন পরেই তিনি যান চট্টগ্রামে। সেখানে তিনি ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি)-এর চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ৫৭তম জাতীয় কনভেনশনে যোগ দেন। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী আরও কয়েকটি জেলা সফর করবেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানায়। সফরের ক্ষেত্রে তিনি অনেক দিন যেসব জেলা-উপজেলায় যাননি এমন স্থানগুলোকে গুরুত্ব দেবেন। এ ছাড়া প্রতিটি সফরেই একটি করে জনসভায় তিনি জাতির উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন বলেও অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত রয়েছে।

সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আগাম নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন শেখ হাসিনা। তার ধারাবাহিকতায় চলছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। তিনি ইতিমধ্যে চট্টগ্রামে দুই দফা, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ, রংপুর, নোয়াখালীসহ বেশ কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।

এমনকি ঢাকায় যুবলীগের একটি ওয়ার্ড সম্মেলনেও প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। বসে নেই দলের অন্য শীর্ষ নেতারাও। প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফর উল্লাহ, ড. আবদুর রাজ্জাক, কর্নেল (অব.) ফারুক খান নিয়মিতই যাচ্ছেন নিজ নির্বাচনী এলাকাসহ অন্যান্য জেলাতেও।

গত ১২ নভেম্বর এবং ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সফর করেন ওবায়দুল কাদের। প্রথম দফায় নিজের সংবর্ধনা উপলক্ষে গেলেও দ্বিতীয় দফায় তিনি সেখানে যান দলের কোন্দল মেটাতে। চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান জননেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় গিয়ে তিনি সেখানকার আরেক নেতা ও চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছিরের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ নেন। ছাত্রলীগের বিবদমান দুই গ্রুপের নেতাদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেন তিনি। এ ছাড়া নিজ জেলা নোয়াখালীতে তিনি এরই মধ্যে একাধিকবার সফর করেছেন। গিয়েছেন দলের আরেক নেতা মাহবুবউল আলম হানিফের জেলা কুষ্টিয়াতেও। সম্প্রতি যশোর কবি মধুসূদন দত্তের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মধু মেলায় যোগ দেন।

ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দুই যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য এসএম কামাল হোসেন প্রমুখ বৃহত্তর রংপুর সফর করেন। তারা গত ২৭, ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি গাইবান্ধা ও রংপুরে একটি শোকসভা, বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন এবং সমাবেশে অংশ নেন। সড়কপথে রংপুরে যাওয়ার পথে সিরাজগঞ্জে পথসভা এবং বগুড়ায় একটি সমাবেশেও অংশ নেন নেতারা।

এ দৌড়ে শামিল হয়েছেন অন্য শীর্ষ নেতা এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরাও। দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ১৪ দলের দেশব্যাপী কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি নিজ নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত সফর করছেন। গত ১৭ জানুয়ারি নিজ নির্বাচনী এলাকায় তিনি দলের আরেক শীর্ষ নেতা আমির হোসেন আমুকে নিয়ে সমাবেশ করেন। আবার গত ৫ ফেব্রুয়ারি তার সঙ্গে সিরাজগঞ্জ সফরে যান দলের অন্যতম সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদও।এরই মধ্যে মোহাম্মদ নাসিম বরিশালও সফর করেছেন। ওই সফরে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বৃহত্তর বরিশালে পর্যায়ক্রমে শীর্ষ নেতাদের অনেকেই সফর করবেন।

সফরে পিছিয়ে নেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফও। তিনি খুলনা, রংপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ অনেক জেলাতেই বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। আরেক যুগ্ম সম্পাদক আবদুর রহমান গত ১৯ জানুয়ারি তার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ খুলনায় প্রতিনিধি সম্মেলন করেছেন। নিয়মিতই যাচ্ছেন নিজ জেলা ফরিদপুরে। ইতিমধ্যে দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম চাঁদপুর জেলা সফর করেছেন। সেখানে তিনি ২টি সমাবেশে যোগ দেয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেন।

ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সফলতার পর এখন কথা বলছেন জেলা-উপজেলা নেতাদের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ঢাকায় এখন পর্যন্ত মানিকগঞ্জে একটি সফর হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলাতেও কর্মসূচি নেয়া হবে।

আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ যুগান্তরকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে সেখানে দলের নেতাদের বড় একটি জমায়েত হয়। দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা সেখানে যোগ দেন।

সিরাজ জানান, তিনি এরই মধ্যে দুই দফা ময়মনসিংহ সফর করেছেন। প্রতিটি জেলায় বর্ধিত সভা এবং বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন করার পরিকল্পনা জানান তিনি। দলে নতুন দায়িত্ব পেয়ে বন ও পরিবেশ সম্পাদক দোলোয়ার হোসেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে অন্তত ৬টি জেলা সফরে অংশ নিয়েছেন।

এদিকে গত কিছুদিন সারা দেশে কর্মসূচি পালন করেছে ১৪ দলও। জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে নেতারা উত্তরবঙ্গে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। গাইবান্ধায় সাঁওতাল পল্লী এবং নাসিরনগরে সংখ্যালঘু হামলার ঘটনার পর ২টি স্থানই সফর করে জোট।

গণসংযোগ এবং প্রচারণার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতেও তৎপর হয়েছে আওয়ামী লীগ। ওবায়দুল কাদের যেখানেই যাচ্ছেন দলের বিভেদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করছেন। বিরোধ মেটাতে কাজ করছেন সাংগঠনিক সম্পাদকরা। বিরোধপূর্ণ এলাকায় গিয়ে কিংবা তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দ্বন্দ্ব মেটানোর চেষ্টা করছেন তারা। নেতারা প্রকাশ্যে বক্তব্যেই বলছেন, আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউই তাদের হারাতে পারবে না। তাছাড়া বিরোধ কমে গেলে বিদ্রোহী প্রার্থীর হাত থেকেও রেহাই পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, যদিও নির্বাচনের এখনও দু’বছর বাকি। কিন্তু একটি নির্বাচনের পরদিন থেকেই আসলে পরবর্তী নির্বাচনের দিকে তাকাতে হয়। আমরা তাই করছি। দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করছি। জনগণের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছি। দেশের উন্নয়ন ও অর্জনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছি। নিজেদের ঐক্য সুদৃঢ় করছি। একমাত্র নির্বাচনই যেহেতু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিচালনার সুযোগ করে দিতে পারে, আমরা সেই নির্বাচনী বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি।