মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
সোমবার এই রায়ের ফলে জামায়াতে ইসলামির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের আর কোনো বাধা রইল না।
গতকাল রবিবার কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনের ওপর শুনানিতে মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়ার জন্য বিশেষভাবে আবেদন জানানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ শুনানি শেষে রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করে।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন: বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। আদালতে কামারুজ্জামানের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ৩ নম্বর অভিযোগে (সোহাগপুর হত্যাকাণ্ড) কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। মূলত তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এ সাজা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের ১১ নম্বর সাক্ষী ঘটনাটি মুরব্বীদের মুখে শুনেছেন। বাকি দু’জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বলা হয়েছে। অথচ জেরায় তারা বলেছেন, তারা কামারুজ্জামানকে প্রথম দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের পর। তাহলে ঘটনার সময় তারা কীভাবে কামারুজ্জামানকে চিহ্নিত করেন?  তিনি বলেন, ২০১১ এবং ’১২ সালে প্রকাশিত দুটি বই আমরা এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছিলাম। বিচার শুরু হওয়ার পর অসত্ উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছে বিবেচনা করে আদালত বই দুটির বক্তব্য নাকচ করেছেন। এখন আমরা ফরিদা আখতারের লেখা ‘মহিলা মুক্তিযোদ্ধা’ (সর্বশেষ সংস্করণ ২০০৮) শীর্ষক একটি বই দাখিল করছি। এই বইতে মামলার ১৩ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষাত্কার রয়েছে। যেখানে তিনি বলেছেন, তার স্বামীকে হত্যা করেছে পাকিস্তানী সেনারা।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ৪ নম্বর অভিযোগেও ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো। সরাসরি জড়িত না থাকার বিবেচনায় আপিল বিভাগ সে সাজা কমিয়ে কারাদণ্ড দেয়। অথচ সরাসরি জড়িত না থাকা সত্ত্বেও আপিল বিভাগই ৩ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এ বিবেচনায় মৃত্যুদ্ণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি আবেদন জানান।
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ১৯৭২ সালে প্রকাশিত পত্রিকায় ও এরপর বিভিন্ন ডকুমেন্টে আল-বদর কমান্ডার হিসেবে কামারুজ্জামানের নাম প্রকাশিত হয়েছে। তিনজন সাক্ষী যদি সাক্ষ্য না-ও দিতেন তবুও কামারুজ্জামানের আল-বদর পরিচয় মুছে যায় না। তিনি যেসব জঘন্য অপরাধ করেছেন তার জন্য কোন অনুকম্পা হয় না। ১৯৭২ সালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়েছিলো। তত্কালীন সংবাদপত্রে ওই খবর প্রকাশিত হয়। আমরা তার তথ্য-প্রমাণও দাখিল করেছি। শুনানির পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কামারুজ্জামান যেসব অপরাধ করেছেন তাতে তার শাস্তি লঘু করার কোন সুযোগ নেই। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মুহাম্মদ মনির বলেন, আমরা আশাকরি কামারুজ্জামান ন্যায়বিচার পাবেন।
প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। গতবছরের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পরদিন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। গত ৫ মার্চ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ আবেদন দায়ের করেন কামারুজ্জামান। দু’দফা তারিখ পেছানোর পর গতকাল আপিল বিভাগে তার শুনানি হয়। এই রিভিউ আবেদন খারিজ হলে নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ পাবেন কামারুজ্জামান। যুদ্ধাপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।