দেশের ৯৯ শতাংশ এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। দুর্গম পার্বত্য এলাকায়ও পৌঁছে গেছে সে নেটওয়ার্ক। ৩-জি প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্ক চলছে। ৪-জি প্রযুক্তিও অচিরেই চালু হবে। আর এভাবে উন্নত বিশ্বে যত আধুনিক প্রযুক্তি আসবে বাংলদেশ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে।

বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবসের অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দিবসটি উদযাপন ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

তথ্য প্রযুক্তি খাতে তার সরকারের এগিয়ে যাওয়ার খতিয়ান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৬ কোটি মানুষের দেশের প্রায় এক কোটি বিদেশেই থাকে। আর ১৫ কোটির মধ্যে মোবাইল ফোনের সিম ব্যবহারের সংখ্যা ১২ কোটি ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৮৬৯টি। যেখানে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় মোবাইল ও ল্যান্ডফোনের গ্রাহক সংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি। ইন্টারনেট সেবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি ৫৬ লাখ ৭৬ হাজার ৬০৯ জন। যা ২০০৯ সালে ছিলো মাত্র ৪০ লাখ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রেখে যাওয়া অচলাবস্থা কাটিয়ে তুলে তার সরকার নির্বাচনী ওয়াদা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর বাস্তবায়ন শুরু করে মাত্র সাড়ে ছয় বছরে এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।

এই সময়ে ইন্টারনেট ডেনসিটি ২.৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ২৭.৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। টেলিডেনসিটি আড়াই গুণ বেড়ে এখন ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আলাদাভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। দেশের তথ্য-প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে একত্রিত করে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করেছি।

টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তির সুফল দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের শুধু আমাদের স্বাধীনতাই দেননি, সেই সময় থেকেই আমাদের দূরদর্শী করে তুলেছেন।

১৯৭৫ সালের জুনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্থাপিত বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র সারাবিশ্বের সাথে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের যোগাযোগের সুদূরপ্রসারী ভিত রচনা করেছিলো। তারই সূত্র ধরে দেশ আজ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছে, বলেন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু তার সাড়ে তিন বছরের সরকারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাত তথা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতির পিতার আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে ‘আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ)’র সদস্যপদ পায়। এরপর তিনিই পার্বত্য চট্টগ্রামের বেতবুনিয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র স্থাপন করেন।

কিন্তু এর মাত্র কিছু দিন পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে অন্যান্য খাতের মত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশের অগ্রগতি থেমে যায়, বেদনাভরে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি: উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি প্রতিপাদ্যে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য সংঘ দিবস ২০১৫ উদযাপনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়টি যেটি ঠিক করা হয়েছে তা আমি সমর্থন করি। সেই সঙ্গে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য গ্রহণের জন্য আমি ধন্যবাদ জানাই।

দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে দেশে টেলিযোগাযোগ, ইন্টারনেট এবং তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। এসকল প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং ব্যবহারে জনসচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে ইন্টারনেট সহজলভ্য করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমরা ইন্টানেটের মূল্য কমিয়েছি। প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেটের মূল্য ২৭ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে সর্বনিম্ন ৬১২ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। এছাড়া সরকারের আইসিটি বিভাগ একটি বেসরকারি মোবাইল অপারেটর এবং ফেসবুকের সহায়তা নিয়ে বিনা পয়সায় ইন্টারনেট সেবা চালু করেছে। একটি অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে এ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সাবমেরিন কেবলের ক্যাপাসিটি ২০০ জিবিপিএস পর্যন্ত বৃদ্ধি কার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে বিনা খরচে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের আন্তর্জাতিক প্রস্তাব যে খালেদা জিয়ার সরকার ফিরিয়ে দেন তার কঠোর সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে এতটুকু জ্ঞান না থাকা দুর্ভাগ্যের বিষয়।

ইন্টারনেট ক্যাপাসিটি আরও বৃদ্ধি করতে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ সংযোগের কাজ চলমান রয়েছে। আশা করি, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ অর্জন করবে।

এরই মধ্যে সরকারের উদ্বৃত্ত ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিকল্পনার কথাও আলোচনায় তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনলাইন ও এসএমএসের মাধ্যমে পরীক্ষার ফল প্রকাশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, কেনাকাটাও করা যাচ্ছে অনলাইনে। এমনকি কোরবানির গরুও ঘরে বসে অনলাইনে কেনা যাচ্ছে। বিল দেওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। কৃষকরা মোবাইল ফোনে ছবি তুলে তার কৃষি সমস্যার জন্য বিভিন্ন সেবা পাচ্ছে। শুধু নির্দিষ্ট কোনো সেক্টর নয়, সব সেক্টরেই মানুষ তথ্য-প্রযুক্তি সেবা পাচ্ছে। মানুষ উপকৃত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আউটসোর্সিং খাতে বাংলাদেশ তৃতীয়। আর সামগ্রিক তথ্য প্রযুক্তিখাতে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি বড় স্থানে রয়েছে। এছাড়া আগামী তিন বছরে আরও ১০ শতাংশ দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনতে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ এমপি, বিটিআরসি চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস। সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী