আমাদের যেভাবে ক্ষতি করছে স্মার্টফোন

0
244

চারদিকে স্মার্টফোনের জয় জয়কার। একের পর এক শক্তিশালী স্মার্টফোন আমাদের তাক লাগিয়ে দিচ্ছে যেন। নির্মানকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ব্যবহারকারিদের একটা সুতোয় বেঁধে ফেলতে চাইছেন, আমরা হয়ে যাচ্ছি প্রযুক্তি নির্ভর। কিন্তু কেউ কি একটুও ভেবে দেখছেন এই প্রযুক্তি নির্ভর দুনিয়ায় আমরা কতটুকু নিজেকে সময় দিচ্ছি। একটি বারও কি ভেবে দেখছেন এই প্রযুক্তির কারণে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে কিনা? দিনে দিনে আমরা যে হারে প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি তা কি আসলেও ভালো? আপনি কি জানেন আপনার পকেটে থাকা ছোট্ট ডিভাইসটিও আপনার উপর বেশ কিছু প্রভাব ফেলছে, ক্ষতি করে চলছে আপনার? বিশ্বাস হচ্ছেনা? আচ্ছা চলুন, সেলফোনের মাধ্যেমে আমরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি তা আপনাদেরকে বলি। মন দিয়ে পড়তে শুরু করুন। আশা করি কাজে আসবে আপনাদের।

এক প্রকারের নেশা

আপনার কাছে অবাক লাগলেও গবেষণা করে দেখা গিয়েছে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার করাটা কোন প্রকারের নেশা করার চাইতে কোন অংশেই কম নয়। আপনি নিজেই যদি এই বিষয়ে লক্ষ্য করেন তবে দেখবেন কিছু মানুষ যাদের দিন এবং রাতের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকে স্মার্টফোন তাদের আচরণে কিছুটা অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। ভার্চুয়াল লাইফ ভিত্তিক জীবনে নির্ভর হয়ে পরা সেই মানুষ গুলো মানসিক ভাবে এমন ভাবে পরিবর্তিত হয় যেন স্বাভাবিক এবং রিয়েল লাইফের অনেক কিছু তাদের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খুব সহজ একটা বিষয় যদি ধরি যেমন, ‘কমিউনিকেট করা’। ভার্চুয়াল লাইফে ভাইবার, স্কাইপ-এর ভয়েস চ্যাট হোক আর ফেসবুকের টেক্সট – খুব স্বাচ্ছন্দে কথা বলতে পারা ছেলে-মেয়েগুলোকেই স্বাভাবিক অবস্থায় সামনা সামনি জড়তা ছাড়া কথা বলতে পারেনা। আবার দেখা যায়, স্বাভাবিক অবস্থার কিছু সমস্যা তারা ভার্চুয়াল লাইফের সাথে তুলনা করে সমাধাণের চেষ্টা করে এবং ব্যার্থ হয়। মোট কথা, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে ধীরে ধীরে অদ্ভুত হলেও সত্যি সে যেন একজন ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা হয়ে দাঁড়ায়।

5

টাইটেলে লিখেছিলাম, এটি এক প্রকারের নেশা; টাইটেলেই ফিরে আসা যাক এখন। ভার্চুয়াল জগতে থাকতে থাকতে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যাই যে স্মার্টফোন ব্যবহারের সময়ে আশে পাশে কি হচ্ছে আমরা অনেক সময়ই খেয়াল করিনা। আপনি হয়তো জানেন, ‘মদ্যপ অবস্থায় ড্রাইভ করা নিষেধ!’ , নিশ্চয়ই এটাও জানেন যে ‘গাড়ি চালোনোর সময়ে মোবাইলে কথা বলাও নিষেধ!’ তাহলে আপনিই চিন্তা করুন, দুটি বিষয়কে একই কাতারে ফেলার অর্থ কি দাঁড়াচ্ছে। মদ্যপ বা নেশা করা অবস্থায় মানুষ স্বাভাবিক ভাবে চিন্তা করতে পারেনা বিধায় সেই অবস্থায় গাড়ি চালানো তার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। একজন মানুষ নেশা করে গাড়ি চালানো অবস্থায় নেশার কারণে মানুষিক অবস্থা স্থিতিশীল না থাকায় দিক, গতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় অ্যাকসিডেন্ট করার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি করে নেয়। একই ভাবে গাড়ি চালানোর সময় যদি কেউ মোবাইলে কথা বলতে থাকেন তবে মনযোগ মোবাইলের অপর প্রান্তের মানুষটির কথার দিকে থাকার কারণে খুব সহজেই সে রাস্তায় অ্যাকসিডেন্ট এর শিকার হতে পারেন। রাস্তায়তো আর শুধু আপনার কারণেই আপনি অ্যাকসিডেন্ট করবেন না, যেহেতু অনেক গাড়িই রাস্তায় চলে থাকে তাই অন্যের ভূলের কারণেও আপনার ক্ষতি হতে পারে। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, গাড়ি যেহেতু সবার কাছে থাকেনা তাই এটি খুবই রেয়ার কেস এবং এর মাধ্যমে উদাহরণ না টানাই ভালো। ঠিক আছে, আমি আপনার কথার সাথে একমত তাই বলছি, আপনি ইন্টারনেটে খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন স্মার্টফোন ব্যবহার করার সময় রেলের ট্র্যাকে এবং রাস্তায় অনেকেই অ্যাকসিডেন্টের শিকার হয়ে থাকেন। আর মোবাইল অপারেট করা অবস্থায় রাস্তায় থাকা ম্যানহোলে পড়ে যাবার ঘটনাও নেহায়েত কম কিন্তু নয়। তাহলে, আপনিই বলুন – স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহার করা বা স্মার্টফোনে মজে যাওয়া নেশার চাইতেও কি খুব একটা কম?

2

প্লে স্টোরে একটা মজার গেম আছে যার নাম হচ্ছে, ‘Dumb ways to die’। এমন যেন না হয় যে একদিন দেখা গেল আপনি এই খেলাটি খেলতে খেলতেই রাস্তায় অ্যাকসিডেন্টের শিকার হয়েছেন।

1

পরিণত হচ্ছি ডিজিটাল জোম্বি!

এটা একটা মজার পয়েন্ট বলতে পারেন। বিভিন্ন রকম হলিউডের ফিল্ম থেকে আপনারা জোম্বি সম্পর্কে যে জ্ঞান লাভ করে থাকেন তা হচ্ছে এটি এমন একটি প্রাণী যার স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতা নেই, ভায়োলেন্ট অংশটুকু না হয় বাদই দিলাম। বর্তমানের প্রজন্ম এতটাই স্মার্টফোন তথা প্রযুক্তি নির্ভর যে তারা ছোট ছোট সমস্যাতেও তাদের মাথা খাটাতে চায়না, বরং সেই সমস্যাটি সমাধানের জন্য প্রযুক্তির সহযোগিতা খুঁজে থাকে। আপনি বলতে পারেন, সমস্যার সমাধান করার জন্যইতো প্রযুক্তির সৃষ্টি। আমি আপনার কথার সাথে একমত। কিন্তু আমার জীবনের একটি এক্সপেরিয়েন্স আপনার সাথে শেয়ার করছি, শুনুন। একদিন ক্লাসে আমরা একটা ছোট্ট ক্লাস টেস্ট দিচ্ছিলাম। তো আমাদের শিক্ষক গার্ড দিচ্ছিলেন, হঠাৎ তিনি খেয়াল করেন একজন ছাত্র পকেট থেকে মোবাইল বের করছে। তিনি আস্তে করে সেই ছাত্রের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পান যে ছাত্রটি মোবাইলের মেন্যু থেকে ক্যালকুলেটর বের করে হিসাব করছে। হিসাবটি ছিলো যোগ এবং বিয়োগ। পরে পরীক্ষা শেষে শিক্ষক আমাদের সাথে শেয়ার করেন ঘটনাটি। তাহলে চিন্তা করুন, আমরা এতটাই প্রযুক্তি নির্ভর যে সামান্য যোগ এবং বিয়োগেও আমাদের প্রযুক্তির সাহায্য লাগছে, তাহলে কি আমি বলতে পারিনা এই আচরণ অনেকটা জোম্বির মতই?

4

আপনি যদি স্টিফেন কিং এর উপন্যাস ‘সেল’ পড়ে থাকেন তবে আপনি নিশ্চয়ই সেই বইয়ে উল্লেখিত আইডিয়াটির কথা জেনে থাকবেন যেখানে একটি উদ্ভট পালস ব্রডকাস্ট করা হয়েছিল একটি সেল্যুলার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এবং সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যারাই স্মার্টফোন দ্বারা কানেক্টেড হচ্ছিলো তারাই নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য এক প্রকারের ব্রেইন-ডেড জোম্বিতে রুপান্তরিত হচ্ছিলো। উপন্যাস যদিও বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে তবে আমরা যদি এটিকে একটি মেসেজ হিসেবে ধরে রিয়েল লাইফের সাথে তুলনা করি তবে এটা কিন্তু ভয়াবহ একটি বিষয়। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে আমরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১০ বারের মত বিভিন্ন কাজে আমাদের স্মার্টফোনটি চেক করে থাকি। চিন্তা করে দেখুন একবার, ব্যাপারটা কিন্তু সত্যিই সাংঘাতিক।

হয়তো এই পয়েন্টটি পারফেক্টলি এই ব্লগের সাথে ম্যাচ করেনি কিন্তু অন্তত স্মার্টফোনের ভয়াবহতা কিছুটা হলেও এর মাধ্যমে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। এখন সত্যিই আমার মনে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, ‘আমরাই কি স্মার্টফোন কন্ট্রলো করে থাকি, নাকি স্মার্টফোন আমাদের কন্ট্রোল করে?’

ক্যান্সার সহ আরও অনেক শারীরিক সমস্যা

অনেক গবেষণার পর জানা গিয়েছে স্মার্টফোন থেকে এক প্রকারের রেডিয়েশন হয় যা মানুষের দেহের মারাত্মক কিছু রোগের জন্য দায়ী। যেমন ধরুন, ব্রেইন ক্যানসার, সালিভারি গ্লান্ড ক্যান্সার এবং এমনকি চোখের ক্যান্সার, যদিও চোখের ক্যান্সার অনেকটাই রেয়ার কেস। যে মহিলারা তাদের অন্তর্বাসের মধ্যে স্মার্টফোন রেখে থাকেন তাদের অনেরকই ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পরে পরবর্তি সময়ে এবং স্মার্টফোনের কারণে ছেলেদের টেস্টিকুলার ক্যানসার ধরা পরে।

3

আপনি কি জানেন আপনার জিন্স প্যান্টের পকেটে রাখা সেল ফোনের সাথে আপনার স্পার্ম প্রোডাকশনের রিলেশন রয়েছে? পকেটে থাকা স্মার্টফোনটির রেডিয়েশন খুব সহজেই আপনার স্পার্ম প্রোডাকশন কমিয়ে দিতে পারে। এই স্মার্টফোনের ফলে কমে যেতে পারে একজন পুরুষের স্পার্ম কাউন্ট এবং প্রতি ইজ্যাকুলেশনে অ্যাকটিভ বা ভালো স্পার্মের পরিমাণও কমিয়ে দেয় এই স্মার্টফোন টেকনোলোজি; সহজ কথায় ‘নষ্ট করতে পারে স্মার্মের কোয়ালিটি’। স্পার্মের কোয়ালিটি মূলত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে থাকে।

  • Sperm motility – স্পার্মের একটি পরিমাণ যা সাধারণ ভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।
  • Sperm viability – স্পার্মের একটি পরিমাণ যা একটি স্যাম্পেলের মধ্যে কার্জকর থাকে, এবং
  • Sperm concentration – ফ্লুইডের মধ্যে স্পার্মের ডেনসিটি।

যাই হোক, আপনি এ বিষয়ের উপর আরও অনেক তথ্য সহজেই পেতে পারেন ইন্টারনেট ঘেটে এবং সচেতন হতে পারেন আজ তেকেই। আর হ্যাঁ, পকেটের এই স্মার্টফোন হয়তো আপনাকে মেরে ফেলবে না তবে আস্তে আস্তে এই সামান্য ডিভাইসটি কমিয়ে দিতে পারে আমাদের এই বিশাল হিউম্যান রেসটিকে। আর এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য আপনি কমিয়ে দিতে পারেন স্মার্টফোনের ব্যবয়াহার, ব্যবহার করতে পারেন চমৎকার লিড-লাইন কেস অথবা পুরু কাপড়ের প্যান্টও কিছুটা সাহায্য করতে পারবে আপনাকে এই বিষয়ে।

শেষ কথাঃ

অনেকতো লিখে ফেললাম, আপনি পড়লেনও। মনে প্রশ্ন জাগছে আপনি এখন কি করতে পারেন বা কি করা উচিৎ? অনেক কাজই কিন্তু আপনি করতে পারেন। যেমন ধরুন, সব সময় সেল ফোন ব্যবহার করা কি আসলেই দরকার? কিছুটা সময় কমিয়ে দিন। দরকার হলে ব্যাকপ্যাকে বহন করুন আপনার স্মার্টফোনটি। ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা ব্যবহার করুন, ফেসবুকে মেসেজ বা ইমেইল না দিয়ে ফিরে যান না চিঠির সেই আদিম কিন্তু সুন্দর সে সময়ে। ফেসবুকের সেই মেয়ে বা ছেলে বন্ধুটির সাথে ভার্চুয়ালি টাইম না কাটিয়ে চলে যান কোন রেস্তোরায় বা পার্কে। মোবাইলে ফুল বা প্রকৃতির ওয়ালপেপার না রেখে বাইরে বের হন, দেখতে পাবেন অনেক ফুল এবং গাছ। আসলে অনেক কিছুই করার আছে আমাদের, কথা হচ্ছে এই ব্যাস্ত সময় থেকে কতটুকু সময় বের করতে পারবেন আপনি! কিন্তু, বেরতো করতেই হবে… নইলে ক্ষতিটাও যে আপনারই হবে।

সুত্র :প্রিয় কম (Abir Hasan)