বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে আরো অবনিত হয়েছে। শুক্রবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।

download (4)

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নিজেদের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক বলে দাবি করলেও সুশীল সমাজের সদস্য এবং গণমাধ্যমের ওপর কঠোরভাবে চড়াও হয়েছে। গত আগস্টে প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী আদিলুর রহমানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারাবন্দি করা হয়। একটি পত্রিকার সম্পাদকসহ ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারাই এদের কাজ এবং নীতিকে সমালোচনা করছে সরকার তাদেরই অভিযুক্ত করছে। এ তালিকায় আছে বিশ্বব্যাংক এবং গ্রামীণব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

বিভিন্ন সময়ে সরকারি বাহিনী প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস এবং বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতে ইসলামের সমর্থক-কর্মী এবং যুদ্ধাপরাধীদের ত্রুটিপূর্ণ বিচার যাতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হচ্ছে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা এই ধরনের পদক্ষেপের শিকার হচ্ছে।

পোশাক শিল্প এবং অন্যান্য শিল্পের কর্মীদের অবস্থা এখনো ভয়াবহ, এ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। যদিও ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানাপ্লাজা ধসে সহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর সরকার এদিকে নজর দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

যদিও সরকার অবশেষে কয়েকজন শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে আনা হালকা অভিযোগ প্রত্যাহার করেছে। ২০১১ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ভুলভাবে আহত লিমন হোসেনের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছে।

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর উত্তেজনা বাড়তে থাকে। যদিও বিরোধী দলে থাকাকালীন আওয়ামী লীগই নির্বাচনে জালিয়াতি ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পক্ষে আন্দোলন করেছে। ক্ষমতায় এসে এরাই এ ব্যবস্থা রহিত করে। একারণে নির্বাচন বয়কট করার হুমকি দিয়েছিল বিরোধী দল। ফলে বিরোধীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ ও সহিংসতার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়।

পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন
২০১৩ সালে বাংলাদেশ মানবাধিকার বিষয়ে মুখ থুবড়ে কয়েক পা পিছিয়ে পড়ল। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের স্বাধীনমনা এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বলে দাবী করে আসা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বাধীন সরকার, সুশীল সমাজ এবং মিডিয়ার সদস্যদের উপরে কঠোর বলপ্রয়োগে লিপ্ত হয়েছেন। অগাস্ট মাসে, তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কারণে মানবাধিকার রক্ষায় প্রমুখ নেতা আদিলুর রহমান খান-কে জেলে পাঠিয়েছে। “অ্যাথেইষ্ট” ব্লগ-লেখকদের গ্রেফতার করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছে একজন খবরের কাগজের সম্পাদককেও। যারা সরকারের কার্যকলাপ আর নীতির সমালোচনা করেছেন, এই সরকার তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার অভিযোগে ক্রমবর্ধমান ভাবে দোষী সাব্যস্ত করছে, যার মধ্যে আছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা এবং নোবেল বিজয়ী মুহম্মদ ইউনুস ও।

অনেক ক্ষেত্রেই সরকার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক হিংসা এবং বে-আইনী পদক্ষেপ নিয়েছে, এর মধ্যে আছে হেফাজত-ই-ইসলামী আন্দোলনের সমর্থকরা এবং ভীষণভাবে ভ্রান্ত যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীরা, যে প্রক্রিয়ায় অনেক দোষীরই মৃত্যুদন্ড হয়েছে।

বস্ত্র ও অন্যান্য শিল্পের কর্মীদের ভীষণ দুর্দশার বেশিরভাগেরই কোন সংস্কার করা হয় নি, যদিও এপ্রিল মাসে রাণা প্লাজা গারমেন্ট ফ্যাক্টরির দুঃখজনক ধ¦ংসকান্ড এবং এরও বেশি কর্মীর মৃত্যুর পরে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার কর্মচারীদের অধিকার রক্ষায় সংগ্রামী বহুসংখ্যক নেতার বিরুদ্ধে তুচ্ছ মনগড়া অভিযোগ তুলে নিয়েছিল। লিমন হোসেন, এক তরুণ যুবক যাকে প্রতিরক্ষা কর্মীরা সালে একটি ভুল অভিযানে ভ্রান্তিবশে গুলি করে আহত করেছিল, এর বিরুদ্ধেও সমস্ত অভিযোগ আদালত তুলে নেওয়ার আদেশ দিয়েছিল।

জানুয়ারীতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনও উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে। যদিও বিরোধী দল থাকাকালীন আওয়ামী লীগ প্রতারণা এবং সুবিধাবাদী মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কেয়ারটেকার ব্যবস্থার কথা বলেছিল, একবার ক্ষমতায় আসার পরে তারা সমস্ত ব্যবস্থা হঠিয়ে দিয়েছিল, যার ফলস্বরূপ বিরোধী দলগুলি নির্বাচন বয়কটের হুমকি দিয়েছে এবং সুরক্ষা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সহিংস লড়াইয়ের সম্ভাবনা বেড়ে গিয়েছে।

সুশীল সমাজ, মিডিয়া এবং বিরোধীদের উপরে তীব্র দমনমূলক আচরণ
ফেব্রুয়ারী মাসে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আই-সি-টি) জামাত-ই-ইসলামী পার্টির নেতা, আবদুল কাদের মোল্লা-কে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করার পরে, বাংলাদেশে সর্ব-ব্যাপী বিক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। মোল্লা -র ফাঁসীর দাবীতে সারা বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে রাস্তায় নেমে আসে। ২৮শে ফেব্রুয়ারী, আই-সি-টি আর এক জামাত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী-কে যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার পরে অবস্থা আরও হিংসার দিকে মোড় নেয়। এই রায়ের পরে, জামাত সমর্থকরা রাস্তায় নেমে পড়ে। জামাত সমর্থকরা অনেকগুলি মৃত্যুর জন্য দায়ী, কিন্তু সুরক্ষা কর্মীরা অনেক সময়েই বিক্ষোভকারী এবং নিরীহ পথচারী-দর্শকদের উপরে নির্বিচারে আক্রমণ করে বহু মৃত্যু ঘটিয়েছে।

একই সময়ে সরকার সমালোচকদের উপরে দমনমূলক আচরণ শুরু করে। বহু ব্লগ-লেখক যারা ইসলামী মৌলবাদীদের তোষণ করার জন্য সরকারের সমালোচনা করেছিলেন তাদের আটক করা হয়।

এপ্রিল মাসে, আইনমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, সরকার সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ, এবং অনলাইন খবরের ওয়েবসাইটগুলির উপরে নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি করবে। ফেব্রুয়ারীর ১৬ তারিখে, বাংলাদেশের টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরী কমিশন, জামাত কর্মীদের দ্বারা চালিত বলে পরিচিত, সোনার বাংলা ব্লগকে, “ঘৃণার বিবৃতি প্রচার ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর” জন্য বন্ধ করে দেয়। বাক্স্বাধীনতার উপরে আরও আক্রমণ করে, ১১ই এপ্রিল পুলিশ বিরোধীপক্ষের খবরের প্রচার মাধ্যম, আমার দেশ এর সম্পাদক, মাহমদুর রহমান -কে আটক করে। পরবর্তীকালে রহমান-কে রাষ্ট্রদ্রোহের দোষে এবং আই-সি-টি’ বিচারক ও বাইরের উপদেষ্টাদের মধ্যে কথাবার্তা, যা প্রাথমিকভাবে ইকনমিষ্ট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, তা হ্যাক (গোপনে সংগ্রহ) করে প্রকাশ করার দোষে অভিযুক্ত করা হয়। ১৪ই এপ্রিল, পুলিশ আর একটি বিরোধী খবরের কাগজ, ডেইলী সংগ্রাম এর অফিসগুলি রেইড করে, এবং পরবর্তীকালে এর সম্পাদককে আমার দেশ ছাপানোর দোষে অভিযুক্ত করা হয়।

অগাস্ট মাসে, একটি প্রথম সারির মানবাধিকার সংস্থা, অধিকার-এর কর্মকর্তা, আদিলুর রহমান খান – ক ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট-এর ধারায় আটক করা হয়, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, একটি মৌলবাদী সংস্থা হেফাজত যখন ইসলামিক নীতিকে আরও বেশি করে অনুসরণ করার লক্ষ্যে মে মাসের ৫-৬ তারিখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল, তখন তাদের ছত্রভঙ্গ করার সময়ে সরকারের সুরক্ষা কর্মীদের দ্বারা নিহতদের সম্বন্ধে তিনি মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন। ১১ই অগাস্ট রাত্রে, পুলিশ অধিকার-এর অফিস খানাতল্লাশী করে কম্পিউটারগুলি বাজেয়াপ্ত করে, যার মধ্যে পীড়িত এবং সাক্ষীদের সম্বন্ধে সংবেদনশীল তথ্য থাকতে পারে। খান -ক বহুবার জামিন দেওয়া হয়নি এবং আপীল করার পরে অক্টোবর মাসে তার জামিন হওয়া পর্যন্ত দুই মাস তাকে কারাগারে বন্দী রাখা হয়।

অক্টোবর মাসে, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট এর সংশোধন করে পার্লামেন্ট একটি বিল পাস করে যাতে কারাবাসের দৈর্ঘ্য বাড়ানো যায়, পুলিশের মত অনুযায়ী আটক করার ক্ষমতা বাড়ানো যায়, এবং বিশেষ কয়েকটি অপরাধকে জামিন-অযোগ্য বলে ঘোষণা করা যায়।

যুদ্ধাপরাধের বিচার
এই নথি লেখার সময় পর্যন্ত, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন ঘটে যাওয়া যুদ্ধাপরাধের বিচারপূর্বক শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে গঠিত আই-সি-টি,আটটি শাস্তি ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে আছে পাঁচটি মৃত্যুদন্ড। মানবাধিকার সংস্থাগুলি দীর্ঘ দিন ধরে দোষীদের সুবিচারের দাবী জানিয়ে আসা সেেত্ত্বও, এই বিচার প্রক্রিয়াগুলি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ড মেনে চলে নি। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে, ইকনমিস্ট বিচারক, প্রসিকিউটর এবং সরকারের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের জঘন্য সাক্ষ্য প্রকাশ করে, যাতে দেখা যায় যে বিচার প্রক্রিয়া, সাক্ষীর প্রশ্নোত্তর এবং লিখিত জবানবন্দী নেওয়ার ব্যাপারে বিচারকরা মামলাকারীদের আদেশ দিচ্ছেন। এই বিস্ময়কর তথ্যের প্রকাশের পরে আই-সি-টি-র মূখ্য বিচারক পদত্যাগ করেন, কিন্তু প্রতিবাদী পক্ষের পুনর্বিচারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়।

যদিও পীড়িত ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আই-সি-টি-এর ছিল, তবুও তারা সাক্ষীদের সুরক্ষার সম্যক দাবীসমূহ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গিয়েছিল। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী কেসে, আসামী পক্ষের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে আদালত এলাকা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আদালত এই অভিযোগের বিরুদ্ধে কোন নিরপেক্ষ তদন্তের আদেশ না দেওয়ায় বিচারকরা একটি বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ খারিজ করে। বহুক্ষেত্রেই, মামলাকারীদের পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের পরস্পরবিরোধী জবানবন্দীকে কোন আমলই দেওয়া হয় নি, এবং বিচারকরা আসামীর পক্ষের সাক্ষীর সংখ্যা ভীষণভাবে সীমিত করে দিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ আব্দুল কাদের মোল্লা -কে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তি রদ করে দিয়েছিল এবং জোর করে আই-সি-টি-র পুনর্বিবেচনা-পূর্বক সংশোধন করে সরকার তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেন, যা আন্তর্জাতিক কোভেন্যান্ট অ্যান্ড পলিটিকাল রাইটস এর আর্টিকল ১৫ এর প্রতি বাংলাদেশের দায়বদ্ধতার সম্পূর্ণ অবমাননা করে। সংশোধনটি সরকারপক্ষকে বিচারকদের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিরূদ্ধে আপীল করার সুযোগ দেয়, যে সুযোগ আই-সি-টি আগে প্রদান করে নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এবং ইকনমিস্ট, সাংবাদিকদের এবং টেলিভিশন অতিথিদেরকে সমালোচনায় করা মন্তব্য ও ট্রাইব্যুনালের উপরে রিপোর্ট করার জন্য আই-সি-টি কারণ দর্শানোর আদেশ দেয়।

বিক্ষোভকারীদের বিরূদ্ধে তীব্র বেআইনী হিংসা প্রদর্শন
বাংলাদেশের সুরক্ষা বাহিনী মাঝেমধ্যেই ছোটখাট পথ-বিক্ষোভের উপর প্রচন্ড বলপ্রয়োগ করেছিল, যার ফলস্বরূপ ২০১৩ সালের ফেব্রুযারী থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত অন্তত: ১৫০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০০০ জন ব্যক্তি। প্রচুর সংখ্যক বিক্ষোভকারী আটক হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষগুলি সুরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহিতার বিষয়ে কোন অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ নেয় নি। মার্চ ও এপ্রিল মাসে শাহবাগ আন্দোলন, জামাত-ই-ইসলামী সমর্থক, এবং সুরক্ষা কর্মীদের মধ্যে লড়াইয়ের সময়ে গুলি চালনায় কমপক্ষে ৯০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন।

মে মাসের ৫-৬ তারিখের হেফাজত- এর বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায়, পুলিশ, আধা-সামরিক র‌্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব), বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ (বিজিবি) জনসমাবেশে কোন বিভেদ না করেই গুলি চালিয়েছে এবং মারাত্মক ও বে-আইনী ভাবে প্রতিবাদকারীদের প্রহার করেছে, ফলস্বরূপ প্রায় ৫০ জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। আওয়ামী লীগ পার্টির তিনজন সদস্যসহ, সুরক্ষা ও পুলিশ বাহিনীর কমপক্ষে এক ডজন অফিসার নিহত হয়েছিলেন।

শ্রমিকদের অধিকার এবং কর্মীদের অবস্থা
অপর্যাপ্ত পরিদর্শন ও অধিনিয়ম-সহ, কর্মস্থলের ভীষণ দুর্বল সুরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে বাংলাদেশের বদনাম অনেকদিনের। এই বিষয়টি গত এপ্রিল মাসে জনসমক্ষে প্রকট হয়েছিল যখন, রাণা প্লাজা ভেঙে পড়েছিল, যেখানে পাঁচটি বস্ত্র কারখানা ছিল। ঐ বিল্ডিংয়ে ফাটল দেখা দেওয়ায় একদিন আগেই সবাইকে বের করে খালি করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শ্রমিকদের আবার কাজে ফিরে যেতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ১,১০০ এর বেশি শ্রমিক মারা গিয়েছিল।

দেশের ভেতরের এবং বিদেশের চাপে, ২০১৩ সালের ১৫ই জুলাই, বাংলাদেশের পার্লামেন্ট শ্রমিক আইনে পরিবর্তন করে। এই সংশোধনে, রেজিস্ট্রেশন করার সময় ইউনিয়নগুলিকে কোন নিয়োগকর্তাকে তাদের নেতার নাম প্রদান করার প্রয়োজনীয়তা বাতিল করা হয় এবং দর কষাকষির সময়ে বাইরের কোন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়, কিন্তু সম্মিলিত হওয়ার স্বাধীনতার উপরে অন্যান্য অনেক বাধানিষেধ প্রত্যাহার করা হয় নি। রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন) যেখানে সর্বাধিক বস্ত্র প্রস্তুত হয় তার ক্ষেত্রে আইনটি কিছু ছাড়ও দেয়। রাণা প্লাজার ঘটনার পরেও, বাংলাদেশের আইন, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা (ইন্টারন্যাশানাল লেবার অর্গানাইজেশন) এর মূল মানদন্ডগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, যার মধ্যে আছে সম্মিলিত হওয়ার স্বাধীনতার ব্যাপারে কনভেনশন নম্বর ৮৭ এবং সমষ্টিগতভাবে প্রতিষ্ঠা ও দর কষাকষির ব্যাপারে কনভেনশন নম্বর ৯৮।

২০১৩ সালে সরকার ফ্যাক্টরীগুলির আরো নিয়মিত পরিদর্শন করার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস থেকে যে পরিদর্শনগুলি শুরু হওয়ার কথা ছিল সেগুলি প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে থমকে আছে।

একটি স্বাগত পদক্ষেপে, কর্তৃপক্ষগুলি বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি সংস্থার নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি খারিজ করে দিয়েছে, যাদের উপরে বছরের পর বছর ধরে মনগড়া তুচ্ছ অভিযোগে হয়রানি ও পীড়ন করা হয়েছে।

ঢাকা-র কাছে অবস্থিত হাজারীবাগ, যা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে দূষিত শহরতলী অঞ্চল, সেখানকার ট্যানারী বা চামড়া কারখানার শ্রমিকরা এখনও ভীষণ বিষাক্ত পরিবেশ সহ্য করে চলেছে। প্রায় ১৫০ টি চামড়ার কারখানা ঐ অঞ্চলে কাজ করে, মূখ্যত রপ্তানীর জন্য চামড়ার সামগ্রী প্রস্তুত করে এবং প্রতিদিন পার্শ¦বর্তী বুড়িগঙ্গা নদীতে ২১ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য ফেলে। ট্যানারীগুলিকে নিয়োজিত কোন শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরের জন্য সরকারের পরিকল্পনা ২০০৫ সাল থেকে অনেকবার বিলম্বিত হয়েছে, আবার ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তুলে রাখা হয়েছে।

২০১৩ সালে পরিবেশ দপ্তর দুটি ট্যানারীকে তাদের বর্জ্য পরিশোধন না করার জন্য জরিমানা করে, এই প্রথমবার যখন হাজারীবাগ-এর ট্যানারীগুলির বিরদ্ধে পরিবেশ আইন বলবৎ হল। এছাড়া পরিবেশ ও শ্রমিক আইনের বলবৎকরণ খুবই কম, যার ফলস্বরূপ ট্যানারীর শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য ও জীবনধারণের মানের উপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

মহিলাদের অধিকার
ধর্ষণের শিকার হওয়া মহিলাদের চিকিৎসা এবং মহিলারা “সহবাসে অভ্যস্ত” কিনা তা যাচাই করার জন্য “দুই-আঙ্গুলের” পরীক্ষা জাতীয় মানহানিকর পরীক্ষা বাতিল করার উদ্দেশ্যে, চিকিৎসাগত-আইনী প্রোটোকলের পরিবর্তন করার জন্য দেশের প্রধান মানবাধিকার সংস্থাগুলি ডাক্তারদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এই সংস্থাগুলি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এই ব্যবস্থাপনাকে সম্মান নিয়ে স্বাস্থ্য ও জীবনধারনের মৌলিক অধিকারের বিরূদ্ধাচারণ বলে চ্যালেঞ্জ করেছে।

মূখ্য আন্তর্জাতিক প্রবক্তাসমূহ
ভারত, যারা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক প্রবক্তা, মানবাধিকারের এই অবস্থার বিষয়ে প্রধানত: নীরব ছিল। বাংলাদেশ এবং ভারত তাদের সীমানা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গেছে বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে বে-আইনী ব্যবসা এবং ভারতীয় সীমা রক্ষীদের দ্বারা অ্ত্যধিক বলপ্রয়োগ, যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশ এবং ভারতের অনেক নাগরিক আহত ও নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশের সাহায্যপ্রদানকারীরা বেশি সরব ছিলেন, যারা সমালোচকদের উপরে দমনমূলক আচরণ বন্ধ করতে সরকারের উপরে চাপ দিয়েছিলেন। সাহায্যপ্রদানকারীরা আদিলুর রহমান খান-এর গ্রেফতারকে খুব শীঘ্রই নাকচ করেছিল, আর আন্তর্জাতিক কমিউনিটির সদস্যরা কোর্টে মামলার প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিল। তবে, সাহায্যপ্রদানকারীরা আই-সি-টি-র দ্বারা সুবিচার প্রদানে ব্যর্থ হওয়ার ব্যাপারে প্রধানত: নীরব ছিলেন।

রানাপ্লাজা ভেঙে পড়ার পরে, ৭০টিরও বেশি ইউরোপীয়ান কোম্পানী বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি করার জন্য নিয়মিত ফ্যাক্টরী পরিদর্শন এবং তার ফলাফল সর্বসমক্ষে প্রকাশ করাকে বাধ্যতামূলক করে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তবে, আমেরিকার ক্রেতারা এই চুক্তিতে যুক্ত হতে অস্বীকার করে এবং তারা একটি পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করে যেটির বিরূদ্ধে শ্রমিকদের মুক্তভাবে ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার অনুমতি না দেওয়ার সমালোচনা করা হয়।

জানুযারী ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন যাতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন তার অনুমতি সরকার সর্বসমক্ষে প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক কমিউনিটি, বিশেষ করে আমেরিকা, সমস্ত দলগুলিকে অনেক আগে থেকেই কোন চুক্তিতে আসার আহ্বান করে সরব হয়েছিল যাতে, নির্বাচন কলহমূলক না হয়, সম্ভাব্য হিংসাপূর্ণ বিক্ষোভ না ঘটে এবং একটি অ-বিশ্বাসযোগ্য ফলাফল না আসে।

সূত্র banglamail