আটা-ময়দা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভিটামিন! ঢাকঢোল পিটিয়ে এসব ভিটামিন আবার বাজারজাতও হচ্ছে। এজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে চট্টগ্রামের নামিদামি ডাক্তারদের। তারা রোগীর প্রেসক্রিপশনে লিখছেন বেনামি কোম্পানির ভিটামিন। রোগীরাও ডাক্তারের ওপর আস্থা রেখে কিনছেন এসব ভিটামিন। প্রতারিত হচ্ছেন মনের অজান্তে। অথচ ফুড সাপ্লিমেন্ট ডাক্তারদের প্রেসক্রাইব করার নিয়ম নেই। আবার ফার্মেসিতেও এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রির ওপর আছে বিধিনিষেধ। কিন্তু বিষয়টি তদারকির জন্য দেশে নেই কোনো কর্তৃপক্ষ। ওষুধ প্রশাসন বলছে, এটি তদারকির এখতিয়ার তাদের নয়। দায় এড়াচ্ছে সিভিল সার্জন অফিসও। তাই মানের পাশাপাশি ভিটামিনের দাম নিয়েও চলছে এখন রমরমা বাণিজ্য।

ড্রাগ (কন্ট্রোল) অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ১৪-এর এ-তে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ডাক্তার অননুমোদিত ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখতে পারবেন না। তবে এ অধ্যাদেশে কোনো শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। আবার ভিটামিন নিয়ে কেউ যাতে প্রতারণা করতে না পারে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দায়িত্বও দেওয়া হয়নি কোনো সংস্থাকে। চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসনের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক কে এম মুহসীনিন মাহবুব বলেন, ‘এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট তদারকির জন্য দেশে কোনো সংস্থা নেই। এ কারণে যেসব বেনামি কোম্পানি এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট বাজারজাত করছে, তারা সবাই অবৈধ। সংস্থা না থাকায় এসব ওষুধের গুণগত মান থাকার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ আমেরিকায় ফুড সাপ্লিমেন্টের মান ও দাম নির্ধারণ করতে আলাদা প্রশাসন রয়েছে।’

২০১৪ সালে চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসন ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে ২৮টি অভিযান পরিচালনা করে। যার মধ্যে প্রায় ১৫টি অভিযানে বেনামি কোম্পানির ৫০ কার্টন ভিটামিন জব্দ করা হয়। অভিযানে জব্দ করা এসব ওষুধের কৌটার ওপর লেখা মেড ইন মালয়েশিয়া-ভারত-চীন ও দেশের মুন্সীগঞ্জ, ঢাকার পুরানা পল্টনসহ আরও নানা স্থানের নাম। এ ছাড়াও এসব ভিটামিনের কৌটায় লেখা নেই উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের কোনো তারিখ। কেবল দামটিই লেখা আছে।

যেভাবে হচ্ছে প্রতারণা: ভিটামিনের গায়ে কেউ লিখছেন এ টু জেড ন্যাচারাল ভিটামিন। কোনোটির গায়ে লেখা মাল্টিভিটামিন প্লাস। আবার কোনোটির ওপর লেখা ভিটামিন ই ও ক্যালসিয়াম। এভাবে একেক কোম্পানি একেক নাম লিখে নির্ধারণ করেছে দাম। নামি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেনামি প্রতিষ্ঠানের ভিটামিনে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠিত স্কয়ার কোম্পানির ভিটামিন ফিলওয়েল গোল্ড ১৫৮ টাকা, ফিলওয়েল সিলভার ১৬০ টাকা ও ক্যালবো ডি ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেক্সিমকো কোম্পানির বেক্সট্রাম গোল্ডের দাম ১৮২, বেক্সট্রাম সিলভার ১৯০ ও অ্যারিসটোক্যাল ডি ১৩০ টাকা। এসিআই কোম্পানির রিভিট্যাক৩২- ১৫৮ ও এসিক্যাল ডি ১৩০ টাকা। এরিস্টোফার্মা কোম্পানির এরিস্টো গোল্ড ১৮০ ও ক্যালবন্ড ১৩০ টাকা।

অথচ কোনো কোম্পানির নাম না থাকলেও অ্যারোক্সিল ফর ম্যান নামক ভিটামিন ১ হাজার ৫৫০ টাকা, ওলিগোকেয়ার ১ হাজার ১৯০ টাকা, ইপাসেট ১ হাজার ১০০ টাকা, ইউনিকেয়ার ৯৯০ টাকা, বেল শার্ক ১ হাজার ৩৯০, সি-জয়েন্ট ১ হাজার ২০০, ক্রক্সি ফর ম্যান ১ হাজার ৫৫০, ফিলগ্রাস্ট ২ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডাক্তারদের মোটা অঙ্কের উপঢৌকন দিয়েই প্রেসক্রিপশনে লেখানো হচ্ছে এসব ভিটামিন।

জানা গেছে, নামিদামি ডাক্তাররা এসব বেনামি কোম্পানির বিভিন্ন ওষুধের নাম প্রেসক্রিপশনে লিখছেন। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে বেনামি কোম্পানির ওষুধের তালিকার সঙ্গে রোগীদের দেওয়া ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশনে। চমেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের এমডি ডা. তৌহিদুর রহমান গত ২৩ নভেম্বর তারিখে ওসমান গনি নামক ৩৫ বছর বয়সী এক রোগীকে ভিসমিট এ টু জেড ও হল ডি-সিয়াম নামক দুটি বেনামি কোম্পানির ভিটামিন দেন। মেডিসিন, হাঁপানি ও অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ ডা. কিউ এম অহিদুল আলম গত ১ নভেম্বর ১১ বছর বয়সী মাইসুর রহমানকে দেন লাইফ-থ্রি নামক ভিটামিন। মেডিসিন ও নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মসিহুজ্জামান (আলফা) করুণা নামক এক রোগীকে বোন্স নামক একটি ভিটামিন দেন। বক্ষব্যাধি-অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ ৯ সেপ্টেম্বর আনোয়ারা বেগমকে ট্যাবলেট পিরফিনিক্স নামক একটি ভিটামিন দেন।

চমেকের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. শেখ আহমেদ ৫৫ বছর বয়সী মো. নুরুল আমিনকে ২৯ সেপ্টেম্বর ক্যাপসুল ডি-সিয়াম নামক একটি ওষুধ দেন। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন অফিসার (চক্ষুু) ডা. প্রণব প্রসাদ দাশ ২৮ সেপ্টেম্বর ৭০ বছর বয়স্ক আজিজুল হককে লাইফ-৩ নামক একটি বেনামি কোম্পানির ভিটামিন লিখে দেন তার প্রেসক্রিপশনে। এক সপ্তাহ নগরীর হাজারী গলির ওষুধের দোকানে আসা প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করে দেখা যায় ৮০ শতাংশ প্রেসক্রিপশনেই আছে নামহীন কোম্পানির মানহীন ভিটামিন।

তথ্যঃ priyo